নভেল করোনাভাইরাসের
মহামারীর মধ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের অর্থনীতিও
যে বড় ধরনের সংকটে
পড়েছে, এক অংকের এই সুদহার তা কাটাতে সহায়তা
করবে বলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে।
বাংলাদেশ
ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফরাহ মো. নাছের শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনেক আলোচনার পর ব্যাংক ঋণের
সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ
করে দিয়ে তা ১ এপ্রিল
থেকে বাস্তবায়ন করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
“অনেকে
ভাবতে পারে, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন
পিছিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই নয়। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকার যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, ৯ শতাংশ সুদহার
তাকে সহায়তা করবে।
“ব্যবসায়ী-শিল্পদ্যোক্তারা কম সুদে ঋণ
নিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করতে পারবে।”
করোনারভাইরাসের
সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের মধ্যে ব্যাংকে সীমিত আকারে লেনদেন চলছে। ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগসহ অনেক শাখা বন্ধ রয়েছে। সে কারণে কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী অনেক ব্যাংক ১ এপ্রিল থেকে
সুদহার ৯ শতাংশে নামাতে
পারেনি।
এখন
শুধু নগদ জমা ও উত্তোলন, জরুরি
বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের জন্য কিছু শাখা সীমিত আকারে খোলা রাখা হয়েছে। অন্য ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
নাছের বলেন,
“লকডাউন শেষ হলে ব্যাংকগুলো এ নির্দেশনা কার্যকর
করবে। যেদিনই এটি বাস্তবায়ন হোক, ১ এপ্রিল থেকে
তা কার্যকর হবে,”
বাংলাদেশ
ব্যাংক গত ২৪ ফেব্রুয়ারি
নিয়ন্ত্রণমূলক সুদহার বিষয়ে এক সার্কুলার জারি
করে। তাতে বলা হয়েছিল, ১ এপ্রিল থেকে
ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণে
৯ শতাংশ সুদহার কার্যকর করতে হবে। বিদ্যমান ঋণের সুদহারও যাই হোক না কেন তা
৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।
‘ঋণ/বিনিয়োগ এর সুদ/মুনাফা
হার যৌক্তিকীকরণ’ শীর্ষক ওই সার্কুলারে বলা
হয়েছিল, “লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, বর্তমানে ব্যাংকের ঋণ/বিনিয়োগের উচ্চ
সুদ/মুনাফা হার দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পসহ
ব্যবসা ও সেবা খাতের
বিকাশে প্রধান অন্তরায় হিসাবে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক ঋণ/বিনিয়োগের সুদ/মুনাফা হার উচ্চ মাত্রার হলে সংশ্লিষ্ট শিল্প, ব্যবসা ও সেবা খাতের
প্রতিষ্ঠানসমূহের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
“ফলে
শিল্প, ব্যবসা ও সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহ
কখনো কখনো প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় বিধায় সংশ্লিষ্ট
ঋণ/বিনিয়োগ গ্রহিতাগণ যথাসময়ে ব্যাংক ঋণ/বিনিয়োগ পরিশোধে
সমর্থ হয় না। ব্যাংকিং
খাতে ঋণ শৃংখলা বিঘ্নিত
হয় এবং সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।”
এ
প্রেক্ষাপটে শিল্প, ব্যবসা ও সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহের
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে
অধিক সক্ষমতা অর্জনসহ শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ
সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ঋণ/বিনিয়োগ পরিশোধে
সক্ষমতা এবং কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়
সর্কুলারে।
>> ক্রেডিট
কার্ড ছাড়া অন্যান্য সকল খাতে অশ্রেণিকৃত ঋণ/বিনিয়োগের উপর
সুদ/মুনাফা হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ
করা হল।
>> কোনো
ঋণ/বিনিয়োগের ওপর ওই হারে সুদ/মুনাফা হার ধার্য করার পরও যদি সংশ্লিষ্ট ঋণ/বিনিয়োগ গ্রহিতা
খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হন, সেক্ষেত্রে যে সময়কালের জন্য
খেলাপি হবেন, অর্থাৎ মেয়াদী ঋণ/বিনিয়োগের ক্ষেত্রে
খেলাপি কিস্তি এবং চলতি মূলধন ঋণ/ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মোট খেলাপি ঋণ/ বিনিয়োগের উপর সর্বোচ্চ ২ শতাংশ হারে
দন্ড সুদ/অতিরিক্ত মুনাফা আরোপ করা যাবে।
>> প্রি-শিপমেন্ট রপ্তানি ঋণের বিদ্যমান সর্বোচ্চ সুদ/মুনাফা হার ৭ শতাংশ অপরিবর্তিত
থাকবে।
>> সুদ/মুনাফা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দণ্ডসুদ/অতিরিক্ত মুনাফা ব্যতিরেকে ঋণ/ বিনিয়োগের উপর অন্য কোন সুদ/মুনাফা/দণ্ডসুদ/অতিরিক্ত মুনাফা আরোপ করা যাবে না।
>> চলতি
বছর থেকে ব্যাংকের মোট ঋণ/বিনিয়োগ স্থিতির
মধ্যে এসএমইর ম্যানুফ্যাকচারিং খাতসহ শিল্প খাতে প্রদত্ত সকল ঋণ/বিনিয়োগ স্থিতি
অব্যবহিত পূর্ববর্তী ৩ বছরের গড়
হারের চেয়ে কোনভাবেই কম হতে পারবে
না।
>> ১
এপ্রিল থেকে এ নির্দেশনা কার্যকর
হবে।
ব্যাংক
ঋণে ৯ এবং আমানতের
৬ শতাংশ সুদ হার বাস্তবায়নের জন্য দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংকগুলোকে চাপ দিয়ে আসছিল সরকার। সরকারি ব্যাংকগুলো এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন
শুরু করলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো ‘নানা অজুহাতে’ গড়িমসি করছিল।
এমনকি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দেওয়ার পরও ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অংকে (সিঙ্গেল
ডিজিট) নামিয়ে আনেনি বেসরকারি ব্যাংকগুলো।
এই পরিস্থিতিতে
গত ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে
উৎপাদন খাতে অর্থাৎ শিল্প খাতে ৯ শতাংশ সুদে
ঋণ বিতরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরপর
৩০ ডিসেম্বর ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)
এবং ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের
(এবিবি) নেতাদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম
মুস্তফা কামাল বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ঋণের সুদ
হার হবে ৯ শতাংশ। জানুয়ারি
নয়, এপ্রিল থেকে এই হার কার্যকর
হবে।