শুক্রবার প্রকাশিত অ্যাকশন এইড ইন্টারন্যাশনাল ও ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন এবং খরাপ্রবণ এলাকায় শস্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ২০৫০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হতে পারে।
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো আকস্মিক দুর্যোগে যারা বাস্তুচ্যুত হবেন, তাদের এই প্রক্ষেপণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আর সে কারণেই এটা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম বলে মনে করছেন অ্যাকশন এইডের গ্লোবাল লিড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ হারজিৎ সিং।
পরিস্থিতি ‘বড় ধরনের বিপর্যয়ের’ দিকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
হারজিৎ বলেন, অনেকে কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে নিজ নিজ দেশের শহরগুলোর দিকে যাবেন। তাদের অধিকাংশের ঠাঁই হবে বস্তিতে। সেখানে সীমিত নাগরিক সেবা পাওয়ার পাশাপাশি রিকশা চালানো, নির্মাণ শ্রমিক বা পোশাক কারখানায় কাজ করার মতো কোনো কাজ করতে হবে তাদের।
বিশ্ব নেতারা এখনও এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সক্রিয় হচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হারজিৎ টমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনকে বলেন, “তারা বিপদের মাত্রা অনুধাবন করতে পারছেন না।”
উচ্চ হারে কার্বন নিঃসরণকারী ধনী দেশগুলোর প্রতি দূষণ কমানোর প্রচেষ্টা বৃদ্ধির আহ্বান জানান তিনি। সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তহবিল যোগানোরও আহ্বান জানান হারজিৎ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার লক্ষ্য অর্জন করা গেলে ২০৫০ সাল নাগাদ ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা অর্ধেক কমে যেতে পারে।
২০১৮ সালে বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ সাব-সাহারা আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ল্যাতিন আমেরিকার ১৪ কোটির বেশি মানুষ নিজেদের দেশের মধ্যে অভিবাসী হতে পারে।
নতুন প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতে সবচেয়ে বেশি মানুষ অভিবাসী হওয়ার আভাস দেওয়া হয়েছে, সাড়ে চার কোটির বেশি।
ঘর্ণিঝড় আম্পানের আগে গত ৯ মে ভোলার চরফ্যাশনের ঢালচর থেকে ট্রলারে উপজেলার মূল ভূখণ্ডে আসছে মানুষ।
তবে বাংলাদেশেই অভিবাসন সবচেয়ে বেশি বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে, বর্তমানের তুলনায় তা সাত গুণ হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তথ্য-বক্তব্য প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের থারপার্কার জেলার রজো (৩৭) ও তার স্বামী দুজনই শ্রমিক, তারা গত তিন বছরে ওই এলাকার মধ্যেই তিন বার বসত বদলেছেন খাবারের সংস্থানের জন্য। তীব্র খরায় ওই অঞ্চলে শস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি গবেষকদের জানান, কাজ করতে গিয়ে একটি শিশু সন্তান হারিয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা খরচ যোগাতে তাকে জমির মালিকের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে।
সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের কাছের একটি দ্বীপের বাসিন্দা কবিতা মাইতিকে পাঁচ বার বসতি বদলাতে হয়েছে সাগরে ঘর ভেসে যাওয়ার কারণে।
“সাগর যতক্ষণ যেতে বাধ্য না করছে ততক্ষণ আমাদের এখানে থাকতে হবে। কারণ অন্য কোথাও জমি কিনে বসতি গড়ার টাকা আমাদের নেই,” বলেন তিনি।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নাগরিকদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার এই প্রকিয়ার আরও খারাপ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অভিবাসী হতে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে এখনই পদক্ষেপ গ্রহণের গুরুত্ব অনুধাবনের অনুরোধ করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ অর্থ ও কাজ দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং শহরের অভিবাসী শ্রমিক যাদের অনেকে কোভিড-১৯ মহামারীতে কাজ হারিয়েছেন তাদের প্রয়োজনীয় সেবার মান্নোয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
জলবায়ু অভিবাসনের লাগাম টানতে কৃষির উন্নয়নে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মাটি যাতে ভালো থাকে, আরও কার্যকরভাবে পানির বন্দোবস্ত করা হয়, নতুন শস্য উৎপাদন করা যায় এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও অর্থ উপার্জনের অন্যান্য উপায় বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষ যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে তখন মাটি নিরাপদ ও উর্বর কি না, জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়েছে কি না এবং তাদের ঘরবাড়ি তৈরির টাকা-পয়সা আছে কি না সে বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে।
ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ার পরিচালক সঞ্জয় ভাষিত বলেন, জলবায়ু অভিবাসন মোকাবেলার ক্ষেত্রে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিষয়গুলোও সামাল দিতে হবে।
“দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের অবশ্যই এক্ষেত্রে সহায়ক শক্তিগুলোর সঙ্গে যোগ দিতে হবে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষায় পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে,” এক বিবৃতিতে বলেন তিনি।