২০১৯ সালের
২০ ডিসেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতিষ্ঠাতার
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিবেচনায় বড় পরিসরে কোনো আয়োজন না থাকার
কথা জানিয়েছে ব্র্যাক।
স্যার ফজলে
হাসান আবেদের জীবন চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে ব্র্যাক ও ব্র্যাক
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অনলাইনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
শনিবার ব্র্যাকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংস্থার সব কর্মী স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তার চিরন্তন অনুপ্রেরণার কথা স্মরণ করছেন
ও দরিদ্র মানুষের পাশে থেকে সমতাপূর্ণ পৃথিবী গড়তে একসাথে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত
করেছেন।
স্যার ফজলে
হাসান আবেদ ৩৬ বছর বয়সে,
১৯৭২ সালে তদানীন্তন সিলেট জেলায় একটি ক্ষুদ্র ত্রাণ ও পুনর্বাসন
প্রকল্প হিসেবে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন।
গত ৪৭ বছরে
বহু বিস্তৃত কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ব্র্যাক বিশ্বের অন্যতম কার্যকরী বেসরকারি উন্নয়ন
সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
মাইক্রোফাইন্যান্স, সামাজিক ব্যবসা,
বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক এবং সুবিধাবঞ্চিত
মানুষের উন্নয়নের লক্ষ্যে নানা মাত্রিক বিনিয়োগ সমন্বয়ে ব্র্যাক এখন বিশ্বের বুকে একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান।
সংস্থাটি
এশিয়া ও আফ্রিকার ১২টি দেশের ১০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছে।
১৯৩৬ সালের
২৭ এপ্রিল তৎকালীন সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার বানিয়াচংয়ে জন্মগ্রহণকারী ফজলে হাসান
আবেদের উচ্চতর পড়াশোনা হয় লন্ডনে, হিসাব বিজ্ঞানে।
১৯৮০ সালে
ম্যাগসেসে পুরস্কার পাওয়া ফজলে হাসান আবেদ জীবনে বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার
মধ্যে রয়েছে বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার, স্পেনিশ অর্ডার অব সিভিল
মেরিট, অফিসার ইন দ্য অর্ডার অফ অরেঞ্জ-নাসাউ, লিও টলস্টয় ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডেল ইত্যাদি।
২০১৪ ও
২০১৭ সালে ফরচুন ম্যাগাজিনের নির্বাচিত ৫০ বিশ্বনেতার মধ্যে ফজলে হাসান আবেদের নাম
স্থান পেয়েছিল।
১৯৫২ সালে
পাবনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন ফজলে হাসান আবেদ। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে
না পড়ে তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান।
১৯৫৪ সালে
ফজলে হাসান আবেদ স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হন।
কিন্তু দুই বছর লেখাপড়া করার পরে তিনি এ বিষয়ে পড়া বাদ দিয়ে লন্ডনে গিয়ে অ্যাকাউন্টিংয়ে
ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে ‘কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিং’-এ প্রফেশনাল কোর্স শেষ করেন তিনি।
শিক্ষাজীবন
শেষে ফজলে হাসান আবেদ ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত লন্ডন, কানাডা ও আমেরিকায়
চাকরি করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে আসেন।
পাকিস্তান
শেল অয়েল কোম্পানিতে সিনিয়র কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ পদে কর্মরত থাকাকালে ১৯৭০ সালের
ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় বদলে দেয় তার জীবন পথ। বন্ধু-পরিচিতদের নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান
তিনি।
এরপর মুক্তিযুদ্ধের
সময় তিনি চাকরি ছেড়ে চলে যান লন্ডনে, সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত
গঠনে কাজ শুরু করেন। স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে আসেন তিনি।
যুদ্ধবিধ্বস্ত
দেশ পুনর্গঠন বিশেষ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষকে স্বাবলম্বী করার প্রয়াসে
১৯৭২ সালে ফজলে হাসান আবেদের হাত ধরে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিসটেন্স কমিটি
(ব্র্যাক) নামে ব্র্যাকের কাজ শুরু হয়।
ব্র্যাক
এখন বিশ্বের ‘সর্ববৃহৎ’ এনজিও হিসেবে স্বীকৃত। এশিয়া,
আফ্রিকা অঞ্চলের ডজনখানেক দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল।
গণশিক্ষা
থেকে শুরু করে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের মতো কাজের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়
ব্র্যাকের কার্যক্রম। বিশ্বের সাড়ে তের কোটি মানুষ ব্র্যাকের
সেবার আওতাভুক্ত। এ সংস্থার কাজ অন্তত ১৫ কোটি মানুষের দারিদ্র্য দূর করতে সহায়ক হয়েছে
বলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য।
দারিদ্র্য
বিমোচনে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের নাইট উপাধিতে ভূষিত হন ফজলে
হাসান আবেদ। ওই বছরই স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে
গঠিত জাতিসংঘ মহাসচিবের পরামর্শদাতা দলের সদস্য করা হয় তাকে। এছাড়া ওই বছর নেদারল্যান্ডসের
নাইটহুড ‘অফিসার ইন দ্য অর্ডার অব অরেঞ্জ-নাসাউ’ খেতাবে ভূষিত হন তিনি।
অনেকেই
মনে করেন, ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের নোবেল পুরস্কার
পাওয়া উচিৎ।
পুরস্কার
ও স্বীকৃতি
বিভিন্ন
ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখায় স্যার ফজলে হাসান আবেদ বহু
পুরস্কার ও স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, শিক্ষা
উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পুরস্কার ‘ইদান প্রাইজ (২০১৯), প্রাক-শৈশব উন্নয়নকর্মকাণ্ডে
অসাধারণ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ লেগো ফাউন্ডেশনের লেগো
পুরস্কার (২০১৮), দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সম্ভাবনা বিকাশে
সুযোগ সৃষ্টির জন্য লুডাটো সি অ্যাওয়ার্ড (২০১৭), ওয়ার্ল্ড
ফুড প্রাইজ (২০১৫), ট্রাস্ট উইমেন হিরো অ্যাওয়ার্ড (২০১৪),
স্প্যানিশ অর্ডার অব সিভিল মেরিট (২০১৪), লিও টলস্টয় ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড
(২০১৪), শিক্ষা ক্ষেত্রে ওয়াইজ প্রাইজ ফর এডুকেশন (২০১১),
ডেভিড রকফেলার ব্রিজিং লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড (২০০৮), ক্লিনটন গ্লোবাল সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড (২০০৭), ইউএনডিপি
মাহবুবুল হক অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং কনট্রিবিউশন টু হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (২০০৪),
ওলফ পামে প্রাইজ (২০০১) এবং র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফর কমিউনিটি
লিডারশিপ (১৯৮০)।
আন্তর্জাতিক
উন্নয়ন সংস্থা অশোকা স্যার ফজলে হাসান আবেদকে বিশ্বের ‘অন্যতম
শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি এর মর্যাদাসূচক গ্লোবাল অ্যাকাডেমি ফর সোশ্যাল অন্ট্রাপ্রেনিওরশিপ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
তিনি আন্তর্জাতিক
সংস্থা কমিশন অন হেলথ রিসার্চ ফর ডেভেলপমেন্ট (১৯৮৭-৯০), ইন্ডিপেনডেন্ট
সাউথএশিয়ান কমিশন অন পোভার্টি অ্যালিভিয়েশন (১৯৯১-৯২) এবং
হাই লেভেল কমিশন অন লিগ্যাল এমপাওয়ারমেন্ট অব দ্য পুওর (২০০৫-২০০৮)-এর সদস্য হিসেবে
দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্যার ফজলে
হাসান আবেদ ২০১০ সালে ব্রিটেনের রানীর দেওয়া নাইটহুড উপাধি লাভ করেন।
২০১০ সালে
জাতিসংঘ মহাসচিবের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রখ্যাত
ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত পরামর্শদাতা দলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
২০১৪ ও
২০১৭ সালে ফরচুন ম্যাগাজিন স্যার ফজলে হাসান আবেদকে বিশ্বের শীর্ষ প্রভাবশালী ৫০
জন ব্যক্তিত্বের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করে।
স্যার ফজলে
হাসান আবেদকে ২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডসের রাজা নাইটহুড উপাধিতে
ভূষিত করেন।