মঙ্গলবার
ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে
হেফাজতের নতুন আমির জুনাইদ বাবুনগরী ও তার মামা
মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর দিকে ইংগিত করে ইউসুফ মাদানী বলেন, “আহমদ শফীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর হেফাজতে ইসলামের
নামে মামা-ভাগ্নের একটি অবৈধ কাউন্সিল করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।”
শফীর
বড় ছেলে বলেন, মুহিবুল্লাহ হেফাজতের কোনো দায়িত্বে না থাকলেও তারই
আহ্বানে ‘অবৈধ’ কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত ‘তথাকথিত’ ওই কমিটিতে বাবুনগরীর
পারিবারিক সদস্য রয়েছেন ২২ জন।
“এছাড়া
দুটি রাজনৈতিক দলের একটির ৩৬ জন আরেকটির
২৪ জন সদস্যকে বিভিন্ন
পদে পদায়িত করে হেফাজতকে একটি চিহ্নিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও দেশে অস্থিতিশীল
পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে।”
গত
১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় হেফাজতে ইসলামের সর্বোচ্চ নেতা ও হাটহাজারী মাদ্রাসার
দীর্ঘদিনের পরিচালক আহমদ শফী মারা যান।
তার
আগের দিন শফীর অব্যাহতি এবং তার ছেলে মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক আনাস মাদানির বহিষ্কার দাবিতে মাদ্রাসায় বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
সেই
দ্বন্দ্বের জেরে ১৭ সেপ্টেম্বর শূরা
কমিটির বৈঠকে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মহাপরিচালকের পদ থেকে স্বেচ্ছায়
পদত্যাগ করেন ‘বড় হুজুর’ শফী।
ওই
বৈঠকে শফীর ছেলেসহ দুই শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে
হাটহাজারী বড় মাদ্রাসায় দৃশ্যত
আহমদ শফীর সুদীর্ঘ দিনের কর্তৃত্বের অবসান ঘটে।
সেই
বৈঠকের পরপরই আহমদ শফীকে মাদ্রাসা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল
কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়া হলে পরদিন তিনি মারা যান।
পরে
নেতৃত্বের প্রশ্নে হেফাজতে ইসলামী বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জুনাইদ বাবুনগরী আমিরের পদে আসেন।
সংবাদ
সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শফীর ছেলে ইউসুফ মাদানী বলেন, “আমিরের ইন্তেকালের পর শূরা নতুন
আমীর নিয়োগ করবে, এখানে পুরো কমিটি ভেঙে নতুন করে কমিটি করার পেছনে উদ্দ্যেশ্য কী? তাহলে তো মহাসচিবের মৃত্যুর
পর নতুন করে পুরো কমিটি গঠন করা প্রয়োজন!”
তার
ভাষায়, “নির্বাহী কমিটি তথা মজলিসে আমেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে এবং
হেফাজতের গুরুত্বপূর্ণ ৭০ জন কাউন্সিলরকে
দাওয়াত না দিয়ে সিন্ডিকেট
করে যে কমিটি গঠন
করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ
ও অসাংবিধানিক।
“আজকের
এই সংবাদ সম্মেলন থেকে আমরা এই অবৈধ কমিটিকে
ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।”
আহমদ
শফীর পর যিনি হেফাজতের
আমির হয়েছেন, তাকে ‘এদেশের জনগণ মেনে নিতে পারে না’ বলেও মন্তব্য করেন ইউসুফ মাদানী।
তিনি
বলেন, “আমরা মনে করি, বর্তমান হেফাজত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একটি পকেট কমিটি গঠিত হয়েছে, যেখানে আল্লামা আহমদ শফীর মূল অনুসারী হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
“বিগত
দিনে যারা আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন, সক্রিয় ছিলেন, জীবনবাজি রেখে, জেল-জলুম উপেক্ষা করে, হামলা-মামলার তোয়াক্কা না করে অগ্রণী
ভূমিকা পালন করেছেন, তাদেরকে পাশ কাটিয়ে এই কমিটি গঠন
করা হয়েছে।”
জুনাইদ
বাবুনগরী গঠনতন্ত্র ‘উপেক্ষা করে’ এককভাবে প্রতিদিন নতুন নতুন সদস্যের নাম ঘোষণা করে চলেছেন বলে অভিযোগ করেন শফীর ছেলে।
তিনি
বলেন, “নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাউন্সিল আহ্বান করে অচিরেই হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে ইনশাআল্লাহ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব জেলা, থানা,
শহর ও নগর কমিটিগুলো
নবায়ন করে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।”
আহমদ
শফী মৃত্যু ‘স্বাভাবিক ছিল না’ মন্তব্য করে ইউসুফ বলেন, “উনার মৃত্যুর আগের তিন দিন হাটহাজারীতে নারকীয় তাণ্ডব ও ধ্বংসলীলা চালানো
হয়েছে। তার অফিস রুম ও হাটহাজারী মাদ্রাসার
অনেক শিক্ষকের রুম ভাঙচুরের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুনিয়াবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।
“জীবনের
শেষ মুহূর্তে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে অতি প্রয়োজনীয় ওধুষ গ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি, রুমের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, এসি-ফ্যানসহ আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছিল, চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটানো হয়েছিল, মুখের অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলা হয়েছিল, হাসপাতালে যেতে বিলম্ব ঘটানো হয়েছিল।”
আহমদ
শফীর বড় ছেলে বলেন, “একশ-ঊর্ধ্ব এই বয়োবৃদ্ধ আলেমের
নাতির গলায় ভাঙা কাচ ধরে বলা হয়েছিল, ‘এই বুইড়া, স্বাক্ষর
কর, না হয় তোর
নাতিকে হত্যা করবো’।”
এভাবে
‘হুমকি দিয়ে জবরদস্তিমূলক স্বাক্ষর নিয়ে’ তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন ইউসুফ।
তিনি
বলেন, একটি ‘চরমপন্থি উগ্রগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে’ তাদের সংগঠনের ‘সহজ-সরল ছাত্রদের উসকানি’ দেওয়া হয়েছে।
“আরো
জঘন্য বিষয় হল, হেফাজতের তথাকথিত আমির জুনায়েদ বাবুনগরী গত ২৩ ডিসেম্বর
হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষকদের সামনে বসিয়ে রেখে বলেছেন, হুজুরের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কি চরম মিথ্যাচার!
এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই।”
বিচার
বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে শফীর ‘অস্বাভাবিক মৃত্যুর রহস্য’ উদ্ঘাটন করে এর সাথে জড়িতদের
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এছাড়া
শফীর পরিবারের পক্ষ থেকে যে হত্যা মামলা
দায়ের করা হয়েছে, তার তদন্ত করে ‘প্রকৃত দোষীদের’ গ্রেপ্তারের দাবি জানান ইউসুফ মাদানী।
হেফাজতের
নতুন কমিটি তবে ঘোষণা করা হবে জানতে চাইলে হেফাজতের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, “আমরা সময় নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। দেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই আমরা নতুন কমিটি ঘোষণা করব।”
অন্যদের
মকধ্যে শফীর ছোট ছেলে আনাস মাদানী, মাওলানা সলিমুল্লাহ, মঈনুদ্দিন রুহী, রুহুল আমিন, দেলোয়ার হোসাইন, আবুল হাসনাত আমিনী, আব্দুল জব্বার, মুফতি আব্দুচ্ছাত্তার, মুফতি নাছির উদ্দিন ও আলতাফ হোসেন
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।