ক্যাটাগরি

স্ত্রী-সন্তানের কথায় ‘আশ্বস্ত’ তাহেরও চললেন ভাসানচরে

নিজে না গেলেও স্বজনদের সঙ্গে স্ত্রী, সন্তানকে পাঠিয়েছিলেন। এবার তাদের কাছ থেকে আশ্বস্ত হয়ে নিজেও যাচ্ছেন সেখানে।

মঙ্গলবার চট্টগ্রাম থেকে নৌবাহিনীর জাহাজে করে ভাসানচরে যাওয়ার আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “থাকা-খাওয়া কেমন হবে সেটা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। তাই প্রথমে যেতে রাজি হইনি। কিন্তু বৌ ও অন্যদের কাছ থেকে শুনেছি, সেখানকার থাকার অবস্থা নাকি টেকনাফের চেয়েও ভালো। তাই নতুন জায়গায় যাচ্ছি।”

দ্বিতীয় দফায় ভাসানচরগামীরা জানালেন, আগে যাওয়া স্বজন-প্রতিবেশীদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে ‘ভালোভাবে থাকার আশায়’ তারাও সেই পথ ধরেছেন।

মঙ্গলবার চট্টগ্রাম থেকে নৌবাহিনীর জাহাজে চড়ে এক হাজার ৮০৪ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী রওনা হন নোয়াখালীর ভাসানচরের পথে। দুপুরে তারা সেখানে পৌঁছান।

কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় দলটিতে সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের শাহীন কলেজে নিয়ে আসা হয়। ছবি: সুমন বাবু

কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় দলটিতে সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের শাহীন কলেজে নিয়ে আসা হয়। ছবি: সুমন বাবু

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে মোটামুটি ১৩ হাজার একর আয়তনের ওই চরে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে এক লাখের বেশি মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

টেকনাফ ও উখিয়ায় থাকা রোহিঙ্গার মধ্যে গত ৪ ডিসেম্বর ১ হাজার ৬৪২ রোহিঙ্গাকে প্রথম দফায় ভাসানচরে নেওয়া হয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই স্থানান্তর নিয়ে বিরোধিতা করে আসছে।

নৌবাহিনী কর্মকর্তারা জানান, দ্বিতীয় দফার যাওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা তাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।

চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের বলেন, “১২ শর মত লোক যাবে বলে ধারণা করলেও শেষ পর্যন্ত এক হাজার ৮০৪ জন ভাসানচরে যাচ্ছে স্বপ্রণোদিত হয়ে।”

আনসার উল্লাহ নামে একজন বললেন, তিন ছেলে-মেয়ে, আর স্ত্রীকে নিয়ে তিনি যাচ্ছেন ভাসানচরে। প্রথম দফায় ভাই, বোন ও শ্যালক গিয়ে জানিয়েছে, সেখানকার অবস্থা ‘ভালো’। তাদের থাকার ঘরও সুন্দর।

“আগে এখানে (টেকনাফে) বাঁশের ঘরে থাকতে হত, নতুন জায়গায় পাকা ঘর, তারা ছবি পাঠিয়েছে। সেগুলো দেখে ভালো লেগেছে বলে এবার আমিও পরিবার নিয়ে চলে যাচ্ছি।”

ষাঠোর্ধ্ব সিদ্দিক প্রায় দুই দশক আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের এসেছিলেন ভালোভাবে বাঁচার আশায়। টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে বাঁশ, পলিথিনে ঘেরা ছোট ঘরে স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনি নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের বড় সময়।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও তার বাইরে অবস্থান নিয়ে থাকা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে নানা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে তাদের একটি অংশকে হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসান চরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয় সরকার।

স্বামী-সন্তানসহ ভাসানচরগামী রহিমা খাতুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর বলেন, “প্রথম দফায় দুই ননদ সেখানে গেছে। তারা পৌঁছেই আমাদের বলেছে, সেখানে চলে যাওয়ার জন্য, সেখানকার অবস্থা নাকি টেকনাফের চেয়ে অনেক ভালো।”

অনেকেই জাহাজে তাদের পোষা হাঁস, মুরগীও সাথে নিয়ে গেছেন। শিশুরা নিয়ে গেছে তাদের প্রিয় খেলনাগুলো। অনেকেই বৃদ্ধ বাবা-মাকে কোলে কিংবা কাঁধে নিয়ে ভাসানচরের জাহাজে উঠছেন।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিদায় দিয়ে নৌবাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের বলেন, “সরকার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য যে আবাসন ব্যবস্থা করেছে, তা বিশ্বে নজিরবিহীন ঘটনা। কোনো দেশের সরকার বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা করেছে বলে আমাদের জানা নেই। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠসহ সকল নাগরিক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

ভাসানচরে পৌঁছানো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আগামী চারদিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে খাওয়ারের ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি।