ওই সময় ভারতে সবে কোভিড-১৯ মহামারী শেকড় বিস্তার করতে শুরু করেছে। তখন ভারত সরকার থেকেই বলা হয়েছিল, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের এই রোগে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
তারপরও সফুরাকে অতিরিক্ত কয়েদিতে ঠাসা তিহার জেলে দুই মাসের বেশি সময় বন্দি রাখা হয়। ২৪ জুন ২০২০ কারাগার থেকে ছাড়া পান সফুরা।
এরপর বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘‘তারা অন্যান্য কয়েদিদের আমার সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল আমি একজন সন্ত্রাসী, হিন্দুদের হত্যা করতে চাই। তখন কয়েদিরা বাইরে যে আন্দোলন হচ্ছে সে সম্পর্কে তেমন কিছু জানত না। তাই তারা জানত না আমি আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছি।”
ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে ২০১৯ সালের শেষ দিকেই আন্দোলন হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল, মূলত দেশটির মুসলমানদের লক্ষ্য করেই ওই আইন তৈরি করা হয়েছে। ২০২০ সালের শুরুর দিকে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ওই আইনের বিরুদ্ধে চরম আন্দোলন শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আন্দোলনের খবর প্রকাশ পায়।
কিন্তু মহামারী প্রতিরোধের নামে ওই আন্দোলন জোর করে থামিয়ে দেওয়া হয়। এমনকী আন্দোলন করতে গিয়ে যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের মুক্তির দাবি নিয়েও সড়কে নামা সম্ভব হয়নি।
কারণ, তত দিনে কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে ভারতে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়। পুরো দেশ অচল করে দেওয়া হয়।
শুধু ভারতেই নয়, এশিয়ার অনেক দেশেই করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধের নামে কঠোর আইন জারি করা হয়। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অনেক বিতর্কিত স্কিমের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। মহামারীর সময় না হলে যেগুলো নিয়ে হয়ত গণআন্দোলন হত।
মানবাধিকার সংগঠন সিভিকাস এর জোসেফ বেনেডিক্ট বিবিসি’কে বলেন, ‘‘ভাইরাস হল শত্রু। জনগণকে সেটির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হল। আর সেই সুযোগে বিভিন্ন দেশের সরকার মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে নিপীড়নমূলক আইন পাস করিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল।”
“যার অর্থ মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকার এক পা পিছিয়ে গেছে,”বলেন তিনি।
শুধু ভারতে নয়, এশিয়ার অনেক দেশের সরকারই এ সুযোগ নিচ্ছে। ফিলিপিন্সে তেরেসিতা নওল নামে ৬২ বছরের একজন সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যার হৃদরোগ এবং হাঁপানি আছে। তার বিরুদ্ধে অপহরণ, বেআইনিভাবে আটকে রাখা এবং বিশৃঙ্খলা ও দাঙ্গা সৃষ্টির জন্য অগ্নিসংযোগের মত গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
দেশটির আরও চার শতাধিক নাগরিকের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনা হয়েছে। যাদের বেশিরভাগই সাংবাদিক এবং সমাজকর্মী। কয়েকজনের উপর হামলা এবং কাউকে কাউকে খুনও করা হয়েছে।
এছাড়া, মে মাসে সরকার দেশটির সবচেয়ে বড় মিডিয়া নেটওয়ার্ক এবিএস-সিবিএন জোর করে বন্ধ করে দেয়। অনেক সংবাদমাধ্যমকে মহামারী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে বাধা দেওয়া হয়। এত কিছুর পরও ফিলিপিন্সে প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুর্তেতে দারুণ জনপ্রিয়।
নেপালের বিদ্যা শ্রেষ্ঠা, যিনি আদিবাসী নেওয়ার সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করছেন। তিনি বিবিসি-কে বলেন, সরকার মহামারীর সুযোগে ‘নেওয়ার’ সম্প্রদায়ের উপর নীপিড়ন চালাচ্ছে।
বিদ্যা বলেন, ‘‘মহামারীর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘন করে কাঠমাণ্ডু ভ্যালির নতুন সড়ক তৈরির জন্য নেওয়ার সম্প্রদায়ের ৪৬টি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ভেঙে দেয়।”
থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা এবং ভিয়েতনামেও নানা ইস্যুতে সরকার মহামারীর সময়টাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদের’ কথা বলে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা এবং বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ উঠেছে।
তাছাড়া, করোনাভাইরাস মহামারী ঠেকাতে বিশেষ ক্ষমতা নিয়ে মাঠে নেমে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধে’ মেতে ওঠার অভিযোগও গত বছর করেছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি।
অন্যদিকে, হংকংয়ে জুনে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের নামে নতুন একটি কঠোর আইন জারি করে চীন। এরপর থেকে এই আইনে অনেকেই আটক হয়েছেন, অনেকে পাচ্ছেন সাজাও।
দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং তাইওয়ানেও ভাইরাস বিস্তারের প্রতিরোধের নামে জনগণের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
সিভিকাসের ‘অ্যাটাক অন পিপল পাওয়ার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার অন্তত ২৬ টি দেশে কঠোর আইনের প্রয়োগ দেখা গেছে এবং আরও ১৬ টি দেশ মানবাধিকারের পক্ষে সরব কর্মীদের বিচার করেছে।
এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সরকার রাষ্ট্রীয় অপকর্ম এমনকী করোনাভাইরাস মোকাবেলা সংক্রান্ত বিষয়েও নানা প্রতিবেদন সেন্সর করে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করেছে।
মহামারীর বছরজুড়ে কঠোর যেসব আইন পাস হয়েছে এবং মানুষজনকে ধরপাকড় করা হয়েছে তার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী; যা থেকে যেতে পারে মহামারী শেষের পরও।