ক্যাটাগরি

অনুর্বর জমিতে কাসাভা চাষে কৃষকের মুখে হাসি

শিল্প মালিকদের আর্থিক প্রণোদনা ও কারিগরি সহায়তার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পতিত জমিতে কাসাভা চাষ করে নিশ্চিত লাভের দেখা পাচ্ছেন চাষীরা। ফলে দিন দিন টিলা-পাহাড় শ্রেণির অনাবাদী পতিত জমি যুক্ত হচ্ছে কাসাভা ফলনে, উন্মোচিত হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।

গ্লুকোজ, বার্লি, সুজি, রুটি, নুডলস, ক্র্যাকার্স, কেক, পাউরুটি, বিস্কুট, পাঁপড়, চিপসসহ শুকনো প্যাকেটজাত খাবারের অন্যতম উপাদান শর্করা বা স্টার্চ মেলে কাসাভা মাড়াই করে।

কাসাভা থেকে উৎপন্ন মিহিদানা কাপড়ের মান বাড়াতে ভূমিকা রাখায় পোশাক ব্যবসায়ীদের কাছেও এর কদর আছে। ঔষধ শিল্পেও ব্যাপকভাবে কাজে লাগে কাসাভার স্টার্চ।

নিজেদের চাহিদা পূরণ করতে গত কয়েক বছর ধরেই রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, কুমিল্লা ও ব্রাক্ষণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে কাসাভা চাষে উদ্বুদ্ধ করছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পেগোষ্ঠী প্রাণ আরএফএল গ্রুপ।

প্রাণ-এর পক্ষ থেকে দেশে কাসাভা চাষের উদ্যোগ নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত এ ফসল চাষে প্রায় দুই হাজার কৃষক চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। চলতি বছর ৩০ হাজার টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এসব কৃষকদের কাছ থেকে কাসাভা সংগ্রহ করছে প্রাণ। 

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় ১৯৯৫ সালে ৫ একর জমিতে কাসাভা চাষ শুরু করেছিলেন মোহাম্মদ আফসার উদ্দিন। দীর্ঘ ২০ বছরের অভিজ্ঞ এই চাষী ২০১৫ সালে প্রাণ গ্রুপের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে আবাদি জমির আওতা বাড়িয়েছেন।

আফসার বলেন, “২০১৪-১৫ সালের দিকে ৩০ একর জমিতে চাষাবাদ করতাম। গত চার বছরে ধাপে ধাপে জমির পরিমান বেড়েছে। এখন আমরা ১০ জন কৃষক জোটবদ্ধ হয়ে ১০০ একর পাহাড়ি জমিতে কাসাভা চাষ করছি।“

এত বিস্তৃতি কীভাবে হল জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখন প্রাণ গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রতি একরের জন্য ৮ হাজার টাকা অগ্রীম পাই। ফলে আমাদের বিনিয়োগের কোনো চিন্তা নেই। তাদের কাছে নির্দিষ্ট লাভে পণ্য বিক্রির নিশ্চিয়তা আছে। কথায় কোনো ঊনিশ-বিশ হচ্ছে না। এই সম্ভাবনা দেখে অনেকেই এগিয়ে আসছেন।”


কাসাভায় আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের
 

আফসারের সঙ্গে ওই এলাকায় রয়েছেন আরও ৯ জন কাসাভা চাষী। একেকজন ১০ একর জমি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। ১০০ একর জমিতে ৫০ থেকে ৬০ জন দিনমজুর সারা বছর ধরে শ্রম দিচ্ছেন। বেতন পাচ্ছেন আড়াইশ টাকা থেকে সাড়ে তিনশ টাকা করে। এর সঙ্গে সহযোগী ফসল হিসাবে কাসাভা ক্ষেতে চাষ করা যাচ্ছে তিল ও হলুদ।

প্রাণ এগ্রো বিজনেসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মাহতাব উদ্দিন বলেন, “২০১৪ সাল থেকে প্রাণ কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে কাসাভা চাষে কৃষকদের উৎসাহ দিয়ে আসছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অব্যবহৃত পাহাড়ি জমির যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে। প্রাণ চাষীদেরকে কাসাভা চাষের প্রশিক্ষণ, আর্থিক প্রণোদনা, কৃষি উপকরণ সহায়তা এবং স্বল্পমূল্যে বীজ দিয়ে সহায়তা করছে। এর ফলে পাহাড়ি অনাবাদী জমিতে কৃষকের কাসাভা চাষে আগ্রহ বাড়ছে।”   

নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত কাসাভা সংগ্রহ ও রোপন দুটোই একসাথে হয়। কৃষকরা কাসাভার ফসল তোলার পরপরই এর বীজ রোপন করেন।

মাহতাব বলেন, “ক্রমেই দেশে একর প্রতি কাসাভার ফলন বেড়ে যাওয়া এবং কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় এ চাষে আগ্রহ বাড়ছে। এছাড়া কন্দাল জাতীয় ফসলের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এই ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।”

প্রাণের পক্ষ থেকে বলা হয়, চলতি মৌসুমে প্রাণের চুক্তিবদ্ধ চাষীরা প্রায় ৫৫০০ একর জমিতে কাসাভা চাষ করেছেন। এ বছরে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার টন। এরই মধ্যে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার টন কাসাভা সংগ্রহ হয়েছে।

“গত বছর আমরা একর প্রতি ৪ টন ফলন পেলেও এ বছর গড়ে ৬ টন ফলন আশা করছি। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, কুমিল্লা ও  ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলায় এসব কাসাভা চাষ হয়েছে,” বলেন মাহতাম।   

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রাণ এর সিলভান এগ্রিকালচারের অধীনে একটি কাসাভা প্রক্রিয়াজাতকরণের প্ল্যান্ট রয়েছে। সেখানে প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার টন কাসাভা প্রক্রিয়াজাত করা যায়। কাসাভা থেকে উন্নত মানের স্টার্চ পাওয়া যায় যা দিয়ে গ্লুকোজ, বার্লি, সুজি, রুটি, নুডলস, ক্র্যাকার্স, কেক, পাউরুটি, বিস্কুট, পাঁপড়, চিপসসহ নানাবিধ খাদ্য তৈরি করা যায়। বস্ত্র ও ঔষুধ শিল্পে ব্যাপকভাবে কাসাভার স্টার্চ ব্যবহৃত হয়।

“এছাড়া কাসাভা সিদ্ধ করে করে ভর্তা বা এর পাউডার আটা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি স্টার্চ দিয়ে অ্যানিমেল ফিডও তৈরি করা যাবে। তাই এই ফসল বাড়ির আশেপাশে যে কোনো অনাবাদী জমিতে আবাদ করলে তা অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার কন্দাল জাতীয় ফসলের উন্নয়নে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে যেন পাহাড়ি, অনাবাদী কিংবা কম উর্বর জমিতে কাসাভা চাষ বৃদ্ধি করা যায়। সরকারের এই উদ্যোগ কাসাভার চাষ সম্প্রসারণেও বড় ভূমিকা রাখছে। তবে এই ফসল নিয়ে পাহাড়ি ও অনুর্বর এলাকার কৃষকদের মাঝে আরও প্রচারণা প্রয়োজন।”