দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, ভারতের দ্য হিন্দু জানিয়েছে, ৩৩ বছর ধরে দ্য নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনে লিখে আসা বেদ মেহতার জীবনাবসান হয় গত শনিবার সকালে, ম্যা্নহাটনের বাসায়।
দেশভাগের আগে ১৯৩৪ সালে লাহোরের এক পাঞ্জাবী পরিবারে জন্ম নেওয়া বেদ মেহতা মাত্র তিন বছরে মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু এই প্রতিবন্ধিতাকে নিজের লেখক সত্ত্বার বিকাশে বাধা হতে দেননি কখনও, সাহিত্যিক দক্ষতা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাকে দমাতে পারেনি এই দৃষ্টিহীনতা।
নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন মেহতা; চারপাশের জগৎকে নিজের আয়ত্তে আনা এবং সেরা উপায়ে তুলে ধরতে ছিলেন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। এই আত্মবিশ্বাসী মনোভাবের বিষয়টি উঠে এসেছিল তার লেখাতেও।
“আমি জানি অন্ধত্ব একটি ভয়ানক প্রতিবন্ধকতা। আমি যদি পরিশ্রম করি, তাহলে আমার বড় ভাই-বোনদের মতই সব করতে পারি, কোনো না কোনোভাবে আমিও তাদের মতো হতে পারি,” লিখেছিলেন তিনি।
বেদ মেহতাকে সবচেয়ে বেশি পরিচিত এনে দিয়েছে তার ১২ খণ্ডের স্মৃতিকথা, যেখানে উঠে এসেছে আধুনিক ভারতের জটিলতা আর নিজের দৃষ্টিহীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প।
এছাড়া তার লেখা ২৪টি বইয়ে উঠে এসেছে ভারতের নানা খণ্ডচিত্র। এর মধ্যে ‘ওয়াকিং দ্য ইন্ডিয়ান স্ট্রিটস’ (১৯৬০), ‘পোট্রেইট অব ইন্ডিয়া’ (১৯৭০) এবং ‘মহাত্মা গান্ধী অ্যানড হিজ অ্যাপস্টলস’ (১৯৭৭) এ দর্শন, ধর্মতত্ত্ব এবং ভাষাতত্ত্বেরও অনুসন্ধান করেছেন তিনি।
তার আত্মজীবনীর প্রথম কিস্তি ছিল ‘ড্যাডিজি’, যা পরে ‘কন্টিনেন্টস অব এক্সাইল’ নামে ১২ খণ্ডে শেষ হয়।
১৯৬১ সালে নিউ ইয়র্কারে বেদ মেহতাকে লেখালেখির সুযোগ করে দিয়েছিলেন ম্যাগাজিনের স্টোরিড এডিটর উইলিয়াম শন।
শন একবার বলেছিলেন, “বেদ মেহতা নিজেকে ম্যাগাজিনের সবচেয়ে আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছেন। তিনি নির্দ্বিধায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিষয়কে কোনো পাণ্ডিত্য ছাড়াই এবং দুর্বোধ্য বিষয়কে অস্পষ্টতা ছাড়াই লিখেন।”
সরাসরি এবং ঝরঝরে লেখনির জন্য সমালোচকদের স্তুতিও পেয়েছেন ১৯৮২ সালে ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশনের ‘জিনিয়াস গ্রান্ট’ পাওয়া মেহতা।
‘অনমনীয় কমনীয়তা, হীরের মতো স্বচ্ছ এবং সম্মোহীত করার শক্তি’- তার লেখার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ২০০৫ সালে গ্লাসগোর দ্য সানডে হেরাল্ড এমনই লিখেছিল।
মেহতা মূলত মুখে বলতেন, আর তার সহকারী সেসব লিখতেন। লেখা শেষ হলে সহকারী বার বার তাকে পড়ে শোনাতেন, যতক্ষণ না সেটি আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে উঠত। মনঃপুত হয়নি, এমন লেখা শতবার ঘষামাজার ঘটনাও আছে তার। নিজেই জানিয়েছিলেন তা।
আত্মবিশ্বাসী বেদ মেহতা কোনো ছড়ি কিংবা পোষা কুকুরের সাহায্য ছাড়াই রাস্তায় হাঁটতেন। বরং কেউ সাহায্যের হাত বাড়ালে বিরক্তই হতেন।
১৫ বছরে বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন বেদ মেহতা। ভর্তি হন লিটল রকের দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের আরকানসাস স্কুলে। এরপর পোমনা কলেজ এবং অক্সফোর্ডে পড়ালেখার পাট চুকিয়ে লেখালেখির জগতে পা রাখেন।
তিনি যখন দ্য নিউ ইয়র্কারে যোগ দেন, তখন তার বয়স ২৬। এরপর তিন দশক ধরে তিনি লিখে গেছেন বিরতিহীন। যেমন লিখেছেন ছোট ছোট প্রবন্ধ, যার কতগুলো আবার সিরিজ আকারেও লিখেছেন। তার লেখার বিষয়বস্তুতেও ছিল বৈচিত্র। অক্সফোর্ড ডন, ধর্মতত্ত্ব, ভারতীয় রাজনীতি ছাড়াও অনেক বিষয় নিয়ে লিখেছেন।
তার অসাধারণ কিছু সৃষ্টির একটি হচ্ছে ‘আ ব্যাটল অ্যাগেইনস্ট দ্য বেউইচমেন্ট অব আওয়ার ইনটেলিজেন্স’ (১৯৬১); যেখানে উঠে এসেছে ব্রিটিশ বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ এবং সে সময়কার দার্শনিক বিতর্কের চিত্র ।
মেহতার আরেকটি অনন্য উপহার ‘জন ইজ ইজি টু প্লিজ’ (১৯৭১)- তরুণ ভাষাবিদ নওম চমস্কি এবং তার রূপান্তরিত ব্যাকরণতত্ত্ব নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা।
এছাড়া ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত মহাত্মা গান্ধীর তিন খণ্ডের জীবনীও তার আলোচিত সৃষ্টিকর্ম।