ক্যাটাগরি

শিশুদের জন্য বাহারি রঙের কদমা, ললিপপ, লজেন্স তৈরি হচ্ছিল যেভাবে

এসব কারখানার পণ্যের একটি অংশ চলে যায় মফস্বলে, গ্রামে-গঞ্জের টং দোকানে। দুই থেকে পাঁচ টাকায় পৌঁছে যায় শিশুদের হাতে।

আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী ও সরকারের খ্যাদ্য কর্মকর্তারা বলছেন, এসব পণ্য নিয়ে দুঃশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে, কারণ শিশুরা এসব পছন্দ করে, খায়।

র‌্যাব-৩ বুধবার পুরান ঢাকার কামালবাগে এরকম কয়েকটি কারখানায় অভিযান চালায়। সেখানে লোহার কাঠামোতে চার থেকে পাঁচতলা টিনশেড বাড়ি গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কিছু।

মূলত অল্প বেতনের চাকরিজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এসব বাড়িতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন। ছোট ছোট ঘরগুলো তিন থেকে চার হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়েছে বসবাসের জন্য।

টিনের বেড়ার পাশ দিয়ে এবং বিভিন্ন তলার ওঠার লোহার সিঁড়ি দিয়ে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ নেওয়া হয়েছে এসব বাড়ির বিভিন্ন তলায়। যে কোনো সময় সেখানে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

কামালবাগে এরকমই একটি বাড়ির তৃতীয় তলায় গড়ে তোলা হয়েছে ‘সোবেল লজেন্স ফ্যাক্টরি’ নামের এক কারাখানা। অভিযানে শুরুতে সেখানেই যান র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। 

তৃতীয়তলার প্রথম অংশে বিভিন্ন কক্ষে বেশ কয়েকটি পরিবার থাকে। অন্য অংশে সোবেল লজেন্স কারখানা। অত্যান্ত নোংরা পরিবেশে সেখানে কদমা, ললিপপ, কফি কাঠি, ইটাকাঠি, ডলার কাঠি, রোল কাঠি, প্যাঁচ কাঠি ললিপপ, রসভরি লজেন্স এবং ভাংচুর ও মার্বেল নামে লজেন্স বা মিষ্টি জাতীয় খাবার তৈরি করা হাচ্ছিল এতদিন।

বিক্রি বাড়ানোর জন্য এসব পণ্যের সঙ্গে প্লাস্টিকের বিভিন্ন খেলনা বা বেলুনও দেওয়া হয় মোড়কের ভেতরে, যদিও আইনে তা নিষেধ।

অভিযানে র‌্যাব ওই কারখানার মালিক সোহেল ব্যাপারী এবং কর্মচারী জাহের দফাদারকে গ্রেপ্তার করে।

সোহেল ব্যাপারীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কী দিয়ে এসব মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরি করা হয়। উত্তরে তিনি বলেন, মূলত চিনি ও আটা দিয়ে তারা লজেন্স ও ললিপপ তৈরি করেন। তাতে বিভিন্ন ধরনের রঙ ব্যবহার করা হয়।

অভিযানে উপস্থিত নিরাপদ খ্যাদ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. কামরুল হাসান বলেন, “কারখানা মালিক অকপটে স্বীকার করেছে, এসব খাবারে তারা হাইড্রোজ ব্যবহার করছে, আকর্ষণীয় করতে দিচ্ছে শিল্প কারখানার রঙ। আবার কদমা বা ললিপপ যাতে একটির সাথে আরেকটা লেগে না যায়, সেজন্য খাবারের বাইরের অংশে সাধারণ মোমের প্রলেপও দেওয়া হয়।

এসব উপাদান ‘ভয়ঙ্কর’ মন্তব্য করে কামরুল বলেন, “এসবের কারণে শিশুর শারীরিক ক্ষতি ছাড়াও স্মৃতিশক্তি কমে যেতে পারে।”

বিএসটিআই এর পরিদর্শক শহীদুল ইসলাম বলেন, সোবেল লজেন্স কারখানার পণ্যে বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করা হচ্ছিল, যদিও এর কোনো অনুমোদনই নেই।

কারখানাটির মালিক সোহেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মাদারীপুরের কালকিনি থেকে আট মাস আগে ঢাকায় এসে এই কারখানা খুলে কদমা ও বিভিন্ন ধরনের ললিপপ তৈরি শুরু করেন তিনি।

দুটি কক্ষের জন্য ভাড়া দিচ্ছেন মাসে ১৫ হাজার টাকা, কারখানায় রয়েছে নয়জন কর্মচারী।

তবে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, “এসব অপরাধী কয়েক মাস আগে ব্যবসা শুরু করার কথা বলে। কিন্তু দেখা যায় আগে অন্য কোথাও সে একই কাজ করেছে।”

পরে পাশের আরেকটি পাঁচতলা টিন ঘেরা বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাব; সেখানে এরকম আরও তিনটি লজেন্স কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়।

আবির লজেন্স, কবির লজেন্স ও সহিদ লজেন্স নামের ওই তিন কারখানা থেকে আব্দুস সালাম, তারেক ও ইয়াসিন নামের তিন কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অভিযানের সময় কারখানা মালিকদের খুঁজে পায়নি র‌্যাব।

পলাশ কুমার বসু বলেন, গ্রেপ্তার পাঁচজনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হবে।

এই চারটি শিশু খাদ্যের কারখানায় অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন র‌্যাব-৩ এর মেজর মো. ঈমাদ উদ্দিন লস্কর।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, প্রায় এক মাস আগে পুরান ঢাকায় অন্য একটি অভিযানে গিয়ে বিভিন্ন দোকানে রঙিন কদমা ও ললিপপ ঝুলতে দেখে ভেজাল শিশুখাদ্যের এই ব্যবসার বিষয়টি তার চিন্তায় আসে।

এরপর প্রায় এক মাস গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে ওই চারটি কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়।

“এরা এখানে উৎপাদন করে আরেক জায়গায় গুদামজাত করে। এর একটি অংশ চলে যায় মফস্বলে। এজেন্টদের মাধ্যমে এসব খাবার গ্রামে গঞ্জে ছোট ছোট দোকানে পৌঁছে দেওয়া হয়।” 

অবৈধ এসব কারখানা কীভাবে ব্যবসা চালিয়ে আসছে জানতে চাইলে চকবাজার থানার ওসি মওদুত হাওলাদার বলেন, “পুলিশ মাঝে মাঝে এসব নকল কারখানার সন্ধানে অভিযান চলায়। তবে এরকম ঘিঞ্জি পরিবেশে আবাস ঘরের কোনো একটি কক্ষে যদি কেউ কারখানা দেয়, সেটা বের করা দুষ্কর। তবে যখনই ধরা পড়ে, তখনই তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়।”

ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার রাজীব আল মাসুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পুরান ঢাকার ওই এলাকা খুবই ঘনবসতিপূর্ণ, নানান রকম কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানে।

“গোয়েন্দা পুলিশ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে মাঝেমাঝে অভিযান চালায়। ভেজাল খাদ্যের কারখানা পাওয়া গেলে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়।”

টিনের বাড়িগুলোর অপরিকল্পিত গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেখে ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, “এসব সংযোগ যে অবৈধ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।”

কীভাবে এসব সংযোগ দেওয়া হয়েছে- তা নিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে বলে জানান তিনি।