উন্নত জীবনের আশায় পশ্চিম ইউরোপে যেতে সীমান্ত পেরোনোর এ চেষ্টাকে তারা নাম দিয়েছে ‘খেলা’।
“আমি এখানে থাকি, স্কুলে যাই না। স্কুলকে অনেক মিস করছি। এখন আমরা কেবল খেলতে যাই, ফিরে আসি; খেলতে যাই, আবার ফিরে আসি,” বাবা-মা আর অন্য দুই ভাইবোনের সঙ্গে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে সীমান্ত পার হওয়ার আরেকটি ব্যর্থ চেষ্টা শেষে ফিরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমনটাই বলেছে কালো চুলের শান্ত, স্নিগ্ধ জয়নফ।
ইরাকি এ পরিবারটি দেশ ছেড়েছে তিন বছর আগে; নানা ঘাট পেরিয়ে এখন তাদের অবস্থান বসনিয়া সীমান্তে, যেখানে তাদের মতোই এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা প্রায় ৮ হাজার শরণার্থী সীমান্ত টপকে পশ্চিম ইউরোপে প্রবেশের ‘সুযোগের অপেক্ষায়’ দিন কাটাচ্ছে।
এ শরণার্থীদের বেশিরভাগই থাকছেন বনে তাঁবু পেতে অথবা গত শতকের শেষ দশকে বসনিয়া যুদ্ধে বিধ্বস্ত ও পরিত্যক্ত বাড়ি, কারখানাগুলোতে।
ইউরোপের ধনী দেশগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টায় থাকা এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য আর উত্তর আফ্রিকার শরণার্থীদের জন্য ২০১৮ সালের পর থেকে বসনিয়া হয়ে উঠেছে সীমান্ত পার হওয়ার ‘ট্রানজিট রুট’।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের সীমান্ত পার হওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে। আর জাতিগত দ্বন্দ্বে বিভক্ত দারিদ্র্যপীড়িত বসনিয়া সরকারের এই সঙ্কট সামাল দেওয়ার মত অবস্থা নেই। ফলে বহু মানুষের জন্য সেখানে আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করা যায়নি।
জয়নফদের পরিবার সীমান্তের কাছে পরিত্যক্ত একটি বাড়ির একটি ঘর ভাগাভাগি করে নিচ্ছে আফগানিস্তান থেকে আসা ৫ সদস্যের অন্য এক পরিবারের সঙ্গে।
জয়নফের বাবা, ৫২ বছর বয়সী হুসেইন হালাফ জাবেরের অভিযোগ, সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টাকালে ক্রোয়েশিয়ান পুলিশের এক কর্মকর্তা তার পেটে আঘাত করেছেন এবং অবমাননাকরভাবে মাটিতে কোরান ছুড়ে ফেলেছিলেন।
নিজের ছেলেমেয়েদের দেখিয়ে তিনি বলেন, “দেখুন, সে অসুস্থ, ও অসুস্থ, সবাই অসুস্থ।”
“আমাদের দোষ কী? সাথে থাকা এই বাচ্চাদের দোষ কী? কোথায় আমাদের মানবাধিকার,” পেটে আঘাতের দাগ দেখাতে দেখাতে প্রশ্ন ছুড়ে দেন অশ্রুসিক্ত হালাফ।
শরণার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়ার সময় ক্রোয়েশীয় পুলিশ সহিংস আচরণ করছে বলে শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ করে এলেও ক্রোয়েশিয়ার পুলিশ তা অস্বীকার করছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
শরণার্থী বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইওএম প্রতিদিন পরিত্যক্ত বাড়ির ঘরটিতে জয়নফদের পরিবার ও তাদের সঙ্গে থাকা আফগান পরিবারকে রেশনের খাবার পৌঁছে দেয়; কখনো পর্যাপ্ত জ্বালানি কাঠ মিললে সেসব খাবার গরম করে নিতে পারে তারা।
বসনিয়ার উত্তরপশ্চিমের সীমান্তবর্তী শহর ভেলিকা ক্লেজুসার কাছে বনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন কয়েকশ শরণার্থী; তারা থাকছেন নাইলনের তাঁবুতে, কোনোমতে আগুন জ্বেলে করছেন রান্না।
“আমরা ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি, পান করছি খালের পানি। ব্যাপক ভুগছি আমরা,” বলেছেন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শহীদ।