ক্যাটাগরি

মুক্তির ১০ বছর পর আবার বন্দি মিয়ানমারের নেত্রী সু চি

১৯৮৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ১৫ বছর তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় কাটিয়েছেন। দেখা করতে পারেননি স্বামী, ছেলেদের সঙ্গে। তারপরও গণতন্ত্রের জন্য তার আপোসহীন লড়াইয়ে গোটা বিশ্বেই আলোড়ন তুলেছিলেন সু চি।

জাতীয় পর্যায়ে অন্যতম ব্যক্তিত্ব থেকে তিনি পরিণত হন বিশ্বের গণতন্ত্রের আইকনে। ১৯৯১ সালে জয় করেন নোবেল শান্তি পুরস্কার। আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মান এবং পুরস্কারও পান।এরপর ২০১০ সালে শেষপর্যন্ত গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি মেলে সু চির।

১০ বছর পেরিয়ে আবারও এক সেনা অভ্যুত্থানে ফের বন্দি হলেন তিনি। সদ্য হয়ে যাওয়া নির্বাচনের ফল নিয়ে বেসামরিক সরকার এবং প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর মধ্যে কয়েকদিনের দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই মিয়ানমারে নতুন এ সামরিক অভ্যুত্থান এবং সু চির আবার বন্দিত্বে ফেরা।

এর আগে সু চি তার মুক্তির পর ২০১২ সালের উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হলে মিয়ানমারের সেনা সরকার ক্রমশ গণতান্ত্রিক কাঠামো স্বীকার করতে শুরু করেছিল। এরপর ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় সু চির দল। স্টেট কাউন্সেলরের বিশেষ ভূমিকা পান সু চি।

সু চি ‘র এই জয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তার জয়কে সবাই প্রত্যক্ষ করেছিল কর্তৃত্ববাদী শক্তির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জয় হিসাবে। তবে সত্যিকারের গণতন্ত্রের জন্য এই একটি নির্বাচনে জয়লাভই যথেষ্ট ছিল না।

মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরুর সময় সেনাবাহিনী কিছু ক্ষমতা ছেড়ে দিলেও  সংসদের ২৫ শতাংশ আসন সেনার জন্য সংরক্ষিত থেকে গেছে। সু চি’র সরকারে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোও থেকে গেছে সেনাদের জন্য সংরক্ষিত। ফলে সুচি ও তার দল এনএলডি –কে একদিকে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা এবং দেশকে আবার সামরিক শাসনের দিকে ঝুঁকতে না দেওয়ার একটি নাজুক অবস্থানে পড়তে হয়েছে।

তাল কেটেছে একবছরের মধ্যেই। রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন অত্যাচার চালাতে শুরু করে তখন সু চি’র বলিষ্ঠ কোনও ভূমিকা দেখা যায়নি। রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করলেও সুচি কোনও ব্যবস্থা নেননি।


মিয়ানমারকে সতর্ক করে সু চির মুক্তি দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

‘জনগণের ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা দেখান’, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে জাতিসংঘ প্রধান

সু চি আটক, মিয়ানমার ফের সেনা নিয়ন্ত্রণে

মিয়ানমারে অভ্যুত্থান: জনমনে ক্ষোভ-উদ্বেগ
 

নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকলাপের ওপর সু চি সরাসরি তেমন কোনও কর্তৃত্ব ছিল না। উপরন্তু প্রকোশ্যে তিনি সামরিক বাহিনীর সাফাই গাওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিন্দিত হন। গণতন্ত্রের প্রচারক হিসাবে সু চি যেসব পদবী অর্জন করেছিলেন  তা কেড়ে নেওয়া হয়, বেশ কিছু পুরস্কারও ফিরিয়ে নেয়া হয়। নোবেল কমিটিও নোটিশ জারি করে।

তবে এতসবকিছুর পরও মিয়ানমারে সু চি ছিলেন বিপুল জনপ্রিয়। পর্যবেক্ষকদের অনেকেই সু চির সামরিক বাহিনীর সমালোচনায় মুখর না হওয়াকে বেসামরিক শাসন সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় দাওয়াই হিসাবেই দেখেছেন।

কিন্তু সুচি যা কিছু বলেছেন বা করে এসেছেন তা সত্যিকারের বিশ্বাসবশতই হোক বা আপোসের কারণেই হোক, তাতে যে কাজের কাজ কিছু হয়নি তা-ই স্পষ্ট হল এ সপ্তাহে। মিয়ানমারের গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকাবাহী সু চি আবার সেনাবাহিনীর হাতেই আটক হলেন। সঙ্গে আটক হলেন তার দলের নেতারাও।

মুক্তি লাভের ১০ বছর পর সু চি এখন আবার দৃশ্যত সেইখানেই ফিরে যাচ্ছেন, যেখান থেকে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছিলেন, সেই আটকাবস্থায়। তার ভাগ্য ঝুলে আছে সেনাবাহিনীর খেয়ালখুশির ওপর।

তবে সু চি ফের বন্দিদশায় ফিরলেও এবারের প্রেক্ষাপট আগের তুলনায় ভিন্ন। তিনি এখন আর ‘এশিয়ার ম্যান্ডেলা’ নন, আগে তাকে যেমনটি বলা হত। রোহিঙ্গদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর দুষ্কর্মে সু চির সহযোগিতার কারণে পশ্চিমা বিশ্বে তার মিত্ররা এমনকী তার দীর্ঘদিনের বন্ধুরাও তার নিন্দা-সমালোচনা করে তাকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরব হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিয়ানমার বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞর কথায়, সু চির প্রতি পশ্চিমাদের মনোভাব এখন শীতল। তাই ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যভাগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ যেভাবে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) জন্য কথা বলে এসেছে, জোরাল সমর্থন দিয়েছে ঠিক সেভাবে এখন আর দেবে না। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেটা ভালই জানে। এখন যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে সু চির তেমন ফায়দা হবে না সেটা তারা বুঝেছে।

রাখাইনসহ মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে সেনাবাহিনী তাদের বজ্রমুঠি এতদিনে আলগা করেনি। তাদের দমনপীড়নে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে গেছে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের কমান্ডার ইন চিফসহ অনেক সামরিক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে।

এভাবে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকার মুখে সেনাবাহিনী এবং সু চি বেসামরিক সরকার উভয়ই চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের আমলে যে চীন ছিল শক্তিশালী মিত্রদেশ; মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে দেশটির হার হয়েছিল।

নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের মিয়ানমার বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ মেলিসা ক্রৌচ সোমবার সিএনএন-কে বলেছেন, চীনের সঙ্গে সখ্যকে এখন মিয়ানমারের জেনারেলরা অভ্যুত্থান পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার পাল্টা শক্তি হিসাবেই দেখতে পারেন।

“মিয়ানমারের পাশে আছে চীন এবং রাশিয়া। পশ্চিমা গণতন্ত্র নিয়ে তাদের মাথাব্যাথা নেই।” মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের আগে সেখানে দুই দেশের প্রতিনিধিরা সফরও করেছেন, বলেন মেলিসা।

ওদিকে, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ তমাস ওয়েলসের কথায়, আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে কিভাবে নিজেদের রক্ষা করতে হবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তা ভালভাবেই শিখে নিয়েছে। তাছাড়া, যেহেতু এরই মধ্যে মিয়ানমারে কিছু পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আছে আর কোভিড মহামারীরও একটি কঠিন সময় যাচ্ছে, তাই পশ্চিমাদের এখন এদিকটিতে খুব বেশি মনোযোগ দেওয়ার অবস্থাও নেই।

ওয়েলসের মতে, মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা আসবে দেশের ভেতর থেকেই। সেনাবাহিনী সে চ্যালেঞ্জ কতটা মোকাবেলা করতে পারবে তা নির্ভর করবে আন্দোলনকর্মী, মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়, ব্যবসায়িক সম্প্রদায় ও অন্যান্যদের নিয়ন্ত্রণ করার ওপর। মিয়ানমারে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরুর পর যে সম্প্রদায়গুলো বেশকিছুটা শক্তি সঞ্চয় করেছে। তারা দেশকে ‘একঘরে’ হতে দেখতে চাইবে না।

মিয়ানমারে বিত্তশালী অনেক মানুষই আছে, তারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা  বজায় রাখার  জন্য সেনাবাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। আর তাছাড়া, সু চি’র ভাবমূর্তি বিশ্বে অনেকটা ক্ষুন্ন হলেও মিয়ানমারে তার জনপ্রিয়তা যে কমেনি নভেম্বরের নির্বাচনের ফলই তা প্রমাণ করেছে; সেনাবাহিনী সে ফল মানুক আর নাই মানুক।

সেনাবাহিনী অবশ্য তাদের বিরুদ্ধে সু চির সমর্থক কিংবা সেনা-বিরোধীদের সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা রুখতে কোনও ত্রুটি করছে না। তারা কেবল সু চি কে আটক করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার দল এনএলডি’র নেতাদেরও পাকড়াও করেছে। পার্লামেন্টের বহু সদস্য, জাতিগত বহু দলের প্রতিনিধিরাসহ মানবাধিকার কর্মীরাও আটক হয়েছেন বলে খবর এসেছে।

আদতে যাদেরই লোকজনকে সংগঠিত করার সক্ষমতা আছে তাদেরকেই বেছে বেছে আটক করছে সেনাবাহিনী। মানুষকে সংগঠিত করার আরও যে হাতিয়ার আছে, যেমন: ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক সেগুলোও প্রায় বন্ধ, টিভি, বেতার সম্প্রচারও বন্ধ- যাতে কী ঘটছে সে ব্যাপারে মানুষ অন্ধকারে থাকে।

তবে, মানবাধিকারর সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ (এইচআরডব্লিউ) এর এশিয়া বিভাগের উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন বলছেন, “দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চার হচ্ছে। তারা ছেড়ে দেবে না। তারা ভবিষ্যতে আবার সেনাশাসনে ফিরতে চায় না। নেত্রী সু চি কেই তারা সামরিক শাসনে ফেরার পথ রুখে দাঁড়ানোর শক্তি হিসাবে দেখে।”