ক্যাটাগরি

জাপান: এক দশক পরও সুনামির ক্ষত ভোলার চেষ্টা

১১ মার্চ ২০১১। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ২ টার ৩০ মিনিট, ক্লাস শেষে স্কুল বাসে ঘরে ফেরার অপেক্ষায় ওকাওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বাসের চালক বাস চালু করে ছোট ছোট বাচ্চাদের তুলছের। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মানানোর জন্মদিন উদযাপনে করছে তার বন্ধুরা।

দুপুর ২ টা ৪৫ মিনিটে সোমা সাতো ঘরের ভেতর একটু ঝাঁকুনি অনুভব করলেন। এর কিছুক্ষণ পর প্রকাণ্ড ঝাঁকুনিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী জন্মদিনের কেকের সঙ্গে মেঝেতে গড়াগড়ি খেল। এভাবে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়েছিল জাপান।

ভূমিকম্পের পর সুনামি এড়াতে কাছের পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়ার আগেই কয়েক মিটার উচ্চতার ঢেউয়ে তলিয়ে গিয়েছিল ওকাওয়া বিদ্যালয়ের ৮০ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। সুনামির ১০ বছর পরও সেই স্কুল চালু হয়নি।

শুধু এই স্কুল নয়, জাপানের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই ভূমিকম্প পরবর্তী সুনামির তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো এক দশক পরও স্বাভাবিক হতে পারেনি।

তলিয়ে যাওয়া ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৪টি প্ল্যান্টের মধ্যে মাত্র আটটি সচল করা গেছে, বাকিগুলো নিয়ে শঙ্কা কাটেনি।

তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা থেকে রক্ষা পেতে কয়েক হাজার অধিবাসীকে সরিয়ে নেওয়ার পর অনেকেই ফিরতে পারেননি চিরচেনা বাসস্থানে।

ছয় মিনিট ধরে রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ওই ভূমিকম্প পরবর্তী সুনামিতে প্রাণ হারান ১৫ হাজার ৯০০ জন । এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন আরও দুই হাজার ৫২৫ জন।

আর গত দশ বছরে সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত ৩ হাজার ৭৭৫ জন বিভিন্ন রোগে ভুগে মারা গেছেন। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছিলেন, যারা আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেননি।

রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার সেই ভূমিকম্পের পর জাপানে আঘাত হানে সুনামি

রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার সেই ভূমিকম্পের পর জাপানে আঘাত হানে সুনামি

সুনামির শিক্ষা

শোক কাটিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় এগিয়ে গেছে জাপান। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় ভূমিকম্প ও সুনামি মোকাবেলায় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি জনগণের জন্য সর্তকতামূলক মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার চালু করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতে নিয়মিত দুর্যোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

দূষণ এড়াতে ১২ লাখ টন তেজস্ক্রিয় পানি, ফসলি জমির মাটিসহ অন্যন্য আবর্জনা সংগ্রহ করেছে দেশটি। ফুকুশিমা প্ল্যান্ট থেকে উচ্চমাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর পর দেশটিতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের জন্য শক্তিশালী আইন তৈরি হয়েছে। সতর্কতার প্রস্তুতিতে চালানো হয়েছে ব্যাপক প্রচার। সেই সাথে তেজস্ক্রিয়তা পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে গবেষণায় জোর দিয়েছে দেশটি।

২০৩০ সালের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা যায় এমন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে জাপান।

দেশটির নবায়নযোগ্য শক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক মিকা ওবায়শি মনে করেন, সুনামির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক চুল্লির প্রভাব থেকে মুক্ত হতেই সরকারের এই পরিকল্পনা। ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে বলে সরকার আশা করছে।

সেন্দায়, ফুকুশিমা, মিয়াগি অঞ্চলে হানা দেওয়া সুনামির ক্ষত শুকানোর জন্য ২৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে পুনর্বাসনের চেষ্টা চালিয়েছে জাপান সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঘরবাড়ি তৈরি জন্য ২৭ হাজার মার্কিন ডলার ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও প্রায় ৪০ হাজার মানুষ এখনো তাদের আগের বাসস্থানে ফিরতে পারেননি।

ভূমিকম্পের পর দশ বছর পেরিয়ে এসে এখনও শোক ভোলার চেষ্টায় স্বজনহারা জাপানিরা।

ভূমিকম্পের পর দশ বছর পেরিয়ে এসে এখনও শোক ভোলার চেষ্টায় স্বজনহারা জাপানিরা।

জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে

মিচিয়ো সুজুকি বাস করতেন ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছেই। সেই ভূমিকম্প ও সুনামির পর তার পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে।

প্রথম রাত নিজেদের গাড়ির মধ্যে কাটানোর পর তারা একটি প্রাইমারি স্কুলে যান আশ্রয়ের জন। সেখানেই জানতে পারেন, ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। তার বাড়ি পড়েছে তেজস্ক্রিয়তায় ছড়িয়ে পড়া অঞ্চলে।

৪৮ বছর বয়সী এ নারী ও তার পরিবার অন্য এক প্রদেশে আবাসন গাড়লেও শৈশব ও জীবনের ফেলে আসা স্মৃতিময় পুরনো বাড়ি এখনো পিছু ডাকে তাদের। সেই দিনের প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপ মনে পড়লে এখনও আতঙ্কে হিম হয়ে আসে শরীর।

কাজুমী এন্ডো সোমা সিটির একজন স্বেচ্ছাসেবক দমকলকর্মী। দুঃস্বপ্নের মত সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “সেই দিনের স্মৃতি আজও আমাকে কাঁদায়। প্রায় আড়াইশ জন প্রতিবেশীর মধ্যে ১০ শতাংশই মারা গেছে। নিজের পরিবারের সদস্যও হারিয়েছি। সুনামির আঘাতে জীবনের মোড় ঘুরে গেছে। স্বপ্নগুলো কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।”

ইউজুরু হানয় অলিম্পিকে স্বর্ণজয়ী একজন স্কেটিং খেলোয়াড়। ২০১১ সালে তার বয়স ছিল ১৬ বছর। সুনামির কয়েক সপ্তাহে আগে তিনি কোবেতে এক শোতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জেনেছিলেন, ১৯৯৫ সালে ৭.৩ মাত্রার ভূমিকম্পের পর কোবে কীভাবে সামলে উঠেছিল।

“সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সুনামির পর আমিও খেলায় ফিরেছিলাম। আমি মনে করি, মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী বেঁচে থাকার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা দরকার,” বলেন তিনি।

এর আগে ১৯২৩ সালে তাইশোও মহাকানতোর ভয়াবহ ভূমিকম্পে টোকিও ও বন্দরনগরী ইয়োকোহামাতে এক লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। পাঁচ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।