তবে সংক্রমণের হার বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলার আসার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানায় বাংলা একাডেমি।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরের এই বইমেলা মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন।
বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। সংস্কৃতি সচিব মো. বদরুল আরেফীন শুভেচ্ছা বক্তব্য ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী স্বাগত বক্তব্য দেবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু রচিত ও বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘আমার দেখা নয়াচীনের’ ইংরেজি অনুবাদের মোড়ক উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে ২০২০ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও দেওয়া হবে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের চলমান প্রেক্ষাপটে বইমেলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদ সংম্মেলনে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ বলেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে নতুন করে ভাবতে হবে। যদি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, মেলা চলানোর মতো সুযোগ না থাকে, সেক্ষেত্রে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।
“আমরা প্রার্থনা করছি, রাষ্ট্র যাতে সেই পর্যায়ে না যায়। সকলে স্বাস্থ্য বিধি মেনে সহযোগিতা করলে আমরা সুন্দরভাবে বইমেলা শেষ করতে পারব।”
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, “ঝড়-বৃষ্টির দাপট, পাশাপাশি করোনাভাইরাস মহামারী- এর ভেতর দিয়ে আমাদের সন্তানেরা, বয়োঃবৃদ্ধ বাবারা এবং আমরা তরুণেরা যারা বইমেলায় অংশগ্রহণ করব, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধৈর্যের সাথে বইমলোয় আসব, এটাই আমাদের কাম্য।”
এবারও শিশুচত্বর মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে থাকবে। তবে মহামারীর কারণে এবার প্রথম দিকে ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে না বলে বাংলা একাডেমির পরিচালক ও মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব জালাল আহমেদ জানান।
তিনি বলেন, “কোভিড পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আমরা শিশু প্রহরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।”
স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার পদক্ষেপ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রবেশপথে হাত ধোয়া ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা থাকবে। মাস্ক ছাড়া কাউকে মেলায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় আমাদের বিভিন্ন টিমও কাজ করবে।”
প্রবেশপথ ও নিরাপত্তা
এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব প্রান্তে নতুন প্রবেশ পথ করা হয়েছে। সব মিলে তিনটি প্রবেশ পথ ও তিনটি বাহির পথ থাকবে। প্রত্যেক প্রবেশ পথে সুরক্ষিত ছাউনি থাকবে, যাতে বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যে মানুষ আশ্রয় নিতে পারেন। বিশেষ দিনগুলোতে লেখক, সাংবাদিক, প্রকাশক, বাংলা একাডেমির ফেলো এবং রাষ্ট্রীয়সম্মাননাপ্রাপ্ত নাগরিকদের জন্য প্রবেশের বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে।
বইমেলার প্রবেশ ও বাহিরপথে পর্যাপ্তসংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জন্য মেলায় এলাকাজুড়ে ৩ শতাধিক ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বইমেলা সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে।
মেলাপ্রাঙ্গণ ও পার্শ্ববর্তী নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকবে। মেলার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মিত ধূলিনাশক পানি ছিটানো এবং প্রতিদিন মশক নিধনের সার্বিক ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
বইমেলার পরিসর
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট জায়গায় এবারের বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১০৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১৫৪টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৮০টি ইউনিট; মোট ৫৪০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৩৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মেলায় ৩৩টি প্যাভিলিয়ন থাকবে।
এবার লিটল ম্যাগাজিন চত্বর স্থানান্তরিত হয়েছে সোহরাওয়া্দী উদ্যানের মূল মেলা প্রাঙ্গণে। সেখানে ১৩৫টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দের পাশাপাশি ৫টি উন্মুক্ত স্টলসহ ১৪০টি স্টল দেওয়া হয়েছে।
একক ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যারা বই প্রকাশ করেছেন তাঁদের বই ও বিক্রি বা প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে। বইমেলায় বাংলা একাডেমি এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে।
বইমেলা প্রতিদিন বিকেল ৩টায় শুরু হয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত তা চলবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। তবে শুক্রবার বেলা ১টা থেকে বেলা ৩টা এবং শনিবার বেলা ১টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বিরতি থাকবে। বইমেলা চলবে আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত।
আলোচনা ও পুরস্কার:
১৯ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়কেন্দ্রিক আলোচনার পাশাপাশি বরেণ্য বাঙালি মনীষার জন্মশতবর্ষ উদযাপন এবং গত এক বছরে প্রয়াত বিশিষ্টজনদের জীবন ও কৃতি নিয়ে সেমিনার হবে। এছাড়া মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, এই অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রতিদিনই রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ এবং আবৃত্তি।
বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০২০ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০২০ বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা বই প্রকাশের জন্য ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে।
এছাড়া ২০২০ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠানকে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার এবং এ-বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে।
এবারের গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করছে নতুন ও পুনর্মুদ্রিত ১১৫টি বই।
সংবাদ সম্মেলনে সংবাদ সম্মেলন বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক অপরেশ কুমার ব্যানার্জির সঞ্চালনায় মেলার নকশা প্রণেতা স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর, বিকাশের মহাব্যবস্থাপক তাহমিদুর রহমান, ক্রস ওয়াক কমিউনিকেশনের ব্যবস্থাপক এম এ মারুফ বক্তব্য দেন।