প্রয়াত এই রাজনীতিবিদের মরদেহ শুক্রবার সকালে
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয় সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। পরে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল
সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গণে এবং নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তার
জানাজায় অংশ নেয় হাজারো মানুষ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত চরিত্র মওদুদ আহমদ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা
সদস্যদের একজন। জিয়াউর রহমানের সময়ে তিনি উপ প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, পরে এইচ এম এরশাদের
সময়ে উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।
সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার
সন্ধ্যায় মৃত্যু হয় তার। ৮১ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ কিডনি ও ফুসফুসের জটিলতাসহ বিভিন্ন
সমস্যায় ভুগছিলেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর রাতে কিছু সময় তার
কফিন গুলশান এভিনিউয়ে তার বাসায় রাখা হয়। রাতে মরদেহ রাখা হয় এভারকেয়ার হাসপাতালের
হিমঘরে।
মওদুদের কফিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয় শুক্রবার সকাল ৯টায়। বেলা সাড়ে
১০টা পর্যন্ত সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব চলে।
স্বামীর কফিনের পাশে বসে ছিলেন শোকগ্রস্ত হাসনা
মওদুদ। মওদুদের ভায়রা তৌফিক ই এলাহী চৌধুরীও শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন শহীদ মিনারে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুক্রবার সকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর,
খন্দকার মোশাররফ হোসেন, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আমানউল্লাহ আমান, হাবিবুর রহমান হাবিব,
আবদুস সালাম, তৈমুর আলম খন্দকার, অধ্যাপক মামুন আহমেদ, শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, জহির
উদ্দিন স্বপন, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, শামীমুর রহমান শামীম, আবেদ রাজা, কাজী আবুল
বাশার, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাদেক আহমেদ খান, নিপুণ রায় চৌধুরী, ছাত্র দলের ফজলুল রহমান
খোকন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জাতীয় পার্টির(কাজী জাফর)
মোস্তফা জামাল হায়দার, আহসান হাবিব লিংকন, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জেএসডির
বেলায়েত হোসেন, গণফোরামের মোশতাক আহমেদ, জাগপার খোন্দকার লুতফর রহমান, আসাদুর রহমান
আসাদ, ন্যাপের গোলাম মোস্তফাসহ বিভিন্ন সংগঠন জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত মওদুদ আহমদের কফিনে
ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
এছাড়া জাসাস, মুক্তিযোদ্ধা দল, ড্যাবসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পমাল্য
অর্পণ করা হয় প্রয়াত এই বিএনপি নেতার কফিনে।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী
সাংবাদিকদের বলেন, “মওদুদ আহমদের সংগ্রামী জীবন, তিনি চলে গেছেন। তিনজন ব্যক্তি আমাদের
মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী সরকারকে সহযোগিতা করতেন, তারা হলেন ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম,
মাহবুব আলম চাষী এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।
“তারা যেভাবে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী
তাজউদ্দীন সাহেবকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন যা বলে শেষ করা যাবে না। আমি মনে করি, মওদুদকে
সর্বদলীয়ভাবে সবাই মিলে আমাদের শেষ শ্রদ্ধা জানানো উচিত।”
মাহমাদুর রহমান মান্না বলেন, “ব্যারিস্টার মওদুদ
আহমদ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতির মধ্যে ছিলেন, সক্রিয় ছিলেন। তার ভূমিকা সেই ছাত্রজীবন
থেকে এই পর্যন্ত লাগাতার ছিল।… তিনি লেখাপড়া জানতেন, সুন্দর করে লিখতেন, আলোচনায়
ভালো বলতেন, রাজনীতিতে পরিচ্ছন্ন ছিলেন সেটা বোঝা যেত। আমি মনে করি যে, মওদুদ সাহেবের
মত উপস্থাপনা এবং এরকম ভূমিকা নিয়ে এরকম রাজনীতিবিদ দেশের জন্য প্রয়োজন ছিল। উনি শেষ
পর্যন্ত তার কাজ সম্পাদন করেছেন।”
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে শুক্রবার সকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, প্রবীণ আইনজীবী মওদুদ আহমদের জানাজা হয়। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে জানাজা
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানের
পর কফিন নিয়ে যাওয়া হয় সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে। সেখানে আইনজীবীরা মওদুদ আহমদের প্রতি
শেষ শ্রদ্ধা জানান।
প্রবীণ আইনজীবী মওদুদ প্রতি শুক্রবার হাই কোর্ট
মসজিদে জুমার নামাজ পড়তেন।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, সুপ্রিম
কোর্ট ও হাই কোর্টের কয়েকজন বিচারক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম,
সা্বেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাংবাদিক শওকত মাহমুদ, আইনজীবী সমিতির
সাবেক সভাপতি জয়নাল আবদীন, বিএনপির শাহজাহান ওমর, ফজলুর রহমান, তৈমুর আলম খন্দকার,
রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, কায়সার কামাল, নাসির উদ্দিন অসীম, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী
সমিতির সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ কয়েকশ আইনজীবী সেখানে মওদুদের জানাজায় অংশ নেন।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুক্রবার সকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান দলের নেতা কর্মীরা। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি
বিএনপির শেষ শ্রদ্ধা
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে মওদুদ
আহমদের কফিন নিয়ে যাওয়া হয় নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে; দীর্ঘদিন
যে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেখানে
প্রয়াত নেতার কফিন দলীয় পতাকায় ঢেকে দেন।
পরে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ
হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, শামসুজ্জামান দুদু, নিতাই
রায় চৌধুরীসহ নেতৃবৃন্দ দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক
রহমান এবং বিএনপির পক্ষ থেকে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন এবং কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
পরে নয়া পল্টনের সড়কে মওদুদের জানাজা হয়। শত
শত নেতা-কর্মী সেখানে জানাজায় অংশ নেন।
বিএনপির শাহজাহান ওমর, আলতাফ হোসেন চৌধুরী,
আহমেদ আজম খান, শামুজ্জামান দুদু, এজেডএম জাহিদ হোসেন, আমান উল্লাহ আামান, আবদুস সালাম,
শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, মাহবুব উদ্দিন খোকন, খায়রুল কবির খোকন, ফজলুল হক মিলন,
সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, মীর সরফত আলী সুপ, আমিনুল হক, মোস্তাফিজুর
রহমান বাবুল, শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, জহির উদ্দিন স্বপন, নাজিম উদ্দিন আল, মফিকুল
হাসান তৃপ্তি, শামীমুর রহমান শামীম, আবদুস সালাম আজাদ, শহিদুল ইসলাম বাবুল, আকরামুল
হাসান, সাইফুল আলম নিরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল কাদির
ভুঁইয়া জুয়েল, ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ
উপস্থিত ছিলেন জানাজায়।
২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর মিয়া গোলাম
পারোয়ার, আবদুল হালিম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম, এনডিপির আবু
তাহের, জাগপার আসাদুর রহমান আসাদ, মুসলিম লীগের শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরীও সেখানে
জানাজায় অংশ নেন।
জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মির্জা ফখরুল
ইসলাম আলমগীর বলেন, “ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ শুধু রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি রাজনীতির
একজন কিংবদন্তী ছিলেন। তিনি অনেক পরিবর্তনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন, প্রতিটি পরিবর্তনের
মূল লক্ষ্য ছিলে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। তার চলে যাওয়া শুধুমাত্র বিএনপির জন্য
নয়, সমগ্র দেশের জন্য, সমগ্র জাতির জন্য অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল।
“ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ একজন অভিভাবক ছিলেন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে, আমাদের দল নিজেদেরকে অত্যন্ত শূন্য মনে করছি এবং তার অভাব অনুভব
করছি। আজকে এ্ই বরণ্যে ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সর্বশ্রেণির মানুষ আসছে, তাকে
শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।”
নোয়াখালীতে দাফন বিকালে
পল্টনে জানাজা শেষে হেলিকপ্টারে করে মওদুদ আহমদের
মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নোয়াখালীতে তার গ্রামের বাড়িতে।
জুমার পর নোয়াখালীর কবিরহাট ডিগ্রি কলেজ মাঠে
এবং আসরের পর কোম্পানিগঞ্জ সরকারি মুজিব মহাবিদ্যালয় মাঠে এবং বিকাল সাড়ে ৫টায় কোম্পানিগঞ্জের
মানিকপুরে আরও তিন দফা জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশে দাফন করা হবে
মওদুদ আহমদকে।
১৯৪০ সালে নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় ব্যারিস্টার মওদুদ
আহমদের জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করে তিনি যুক্তরাজ্যে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল
ডিগ্রি নেন। পরে দেশে ফিরে যুক্ত হন আইন পেশায়।
কবি জসীমউদ্দীনের জামাতা ব্যারিস্টার মওদুদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মপক্ষ সমর্থন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ
স্বাধীন হওয়ার পর তাকে প্রথম পোস্ট মাস্টার জেনারেল করা হয়।
পরে দেশের প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগ দেন মওদুদ। বিএনপি
গঠনে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জিয়া তাকে মন্ত্রী ও পরে উপপ্রধানমন্ত্রী করেছিলেন।
জিয়ার মৃত্যুর পর মওদুদ সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাত ধরেন।
এরশাদের নয় বছরের শাসনামলে তিনি মন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং উপরাষ্ট্রপতির
দায়িত্বও পালন করেন।
এরশাদ সরকারের পতনের পরও জাতীয় পার্টিতেই ছিলেন মওদুদ। ১৯৯৬ সালের সংসদ
নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর তিনি বিএনপিতে ফেরেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট
সরকারে তিনি আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত মওদুদ, আইন ও সমকালীন রাজনীতি নিয়ে বেশ
কয়েকটি বইও লিখেছেন। স্বায়ত্বশাসন থেকে স্বাধীনতা, বাংলাদেশ: শেখ মুজিবুর রহমানের
শাসনকাল, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ – প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামরিক
শাসন, এ স্টাডি অব দ্য ডেমোক্রেটিক রেজিমস, কারাগারে কেমন ছিলাম, বাংলাদেশ: ইমার্জেন্সি
অ্যান্ড আফটারম্যাথ ২০০৭-২০০৮ তার উল্লেখযোগ্য
বই।