ক্যাটাগরি

সোনার বাংলার সোনালি ৫০

সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বাংলাদেশের প্রস্তুতির মধ্যেই উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার সুখবরটি আসে। আর স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এসেছে উদযাপনের দ্বিগুণ প্রাপ্তি হয়ে।

এই মাহেন্দ্রক্ষণে জাতিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ প্রাপ্তি মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সন্ধিক্ষণে জাতির জন্য এক ‘অনন্য উপহার’।

“টেকসই উন্নয়নের এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে মাথা উচু করে দাঁড়াবে, ইনশাআল্লাহ।”

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়লে মুক্তি মেলেনি বাংলার মানুষের। জীবন ছিল পাকিস্তানি  শেকলে বাঁধা। সেই শেকল ভাঙার মন্ত্র দিয়ে বাঙালিকে জাগিয়ে তোলেন শেখ মুজিব। বাংলার মানুষ যাকে ভালবেসে নাম দেয় বঙ্গবন্ধু।

জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে শোভা পাচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। ছবি:  আসিফ মাহমুদ অভি

জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে শোভা পাচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বজ্রবাণীর পর ২৫ মার্চ ঢাকায় যে বিভীষিকা নামিয়ে এনেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী; তা একটি প্রতিরোধ যুদ্ধের মুখোমুখি করে দেয় বাঙালিদের।

২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বেতারবার্তায় যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, সেই মুহূর্তে ঘোর অন্ধকার, হানাদারের গুলি আর বেয়নেটে ক্ষতবিক্ষত দেশ। চলে নয় মাসের তীব্র লড়াই। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, অসংখ্য নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে আসে সেই স্বাধীনতা।

তারপর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি মুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে ফেরার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা আসে স্বাধীনতার; পরম শ্রদ্ধায় তাকে জাতির পিতা হিসেবে বরণ করে নেয় নতুন দেশ।

স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ষড়যন্ত্রের জালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ঘটে। এরপর বাংলাদেশের উল্টোযাত্রা শুরু হলেও কয়েক দশক বাদে ক্ষমতায় ফিরে বাংলাদেশকে পথে ফেরানোর দায়িত্ব নেয় স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ।

উচ্চ প্রবৃদ্ধি, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠা, দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনা, নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা সূচকে অগ্রগতির পর বাংলাদেশের লক্ষ্য এখন উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশের কাতারে পৌঁছানো।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষ্যে রাজধানীর বিজয় সরণির উড়োজাহাজ ভাস্কর্যের পাশেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকার আদলে স্থাপনা। স্থাপনাটির উপরে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষ্যে রাজধানীর বিজয় সরণির উড়োজাহাজ ভাস্কর্যের পাশেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকার আদলে স্থাপনা। স্থাপনাটির উপরে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

জাতিকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় জানিয়ে প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বলেছেন, “আসুন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এ মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা শপথ নিই- মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ করে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরতামুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলব।”

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পাওয়া বাঙালির গত ৫০ বছরের চলার পথও মসৃণ ছিল না। শত বাধা অতিক্রম করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই এগিয়ে যাওয়ার অফুরন্ত প্রাণশক্তি এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, প্রবাসী কর্মীরা। খেটে খাওয়া মানুষের শ্রমে-ঘামে গড়ে উঠছে অর্থনীতির ভিত।

সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজকের এই অর্জন এ দেশের সাধারণ মানুষের। এ দেশের কৃষক-শ্রমিক-পেশাজীবী, আমাদের প্রবাসী ভাইবোনেরা, এ দেশের উদ্যোক্তাগণ – তাদের শ্রম, মেধা এবং উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে দারিদ্র্য নিরাময়ের অসম্ভব কাজকে সম্ভব করে তুলেছেন।

“আমার সরকার শুধু নীতি সহায়তা দিয়ে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে। আপনারা প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের মানুষ অনুকূল পরিবেশ পেলে যে কোনো অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে।”

গণহত্যার রাতে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ এখন পার করছে মহামারির চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রদায়িকতা আর দুর্নীতির ভাইরাসও দূর হয়নি। কিন্তু তো এ দেশ তো মাথা নোয়াবার নয়! 

১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ মধ্য রাতে আজিমপুর এলাকায় পকিস্তানপন্থি ইপিআর সদস্যদের প্রতিরোধ করেছিলেন নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া নাজির আহমেদ চৌধুরী। পরে সিলেটের জকিগঞ্জে প্রতিরোধ যুদ্ধে গুলিতে ডান চোখ হারান তিনি।

কী চেয়েছিলেন, তার কতটুকু পেয়েছেন- স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এমন প্রশ্নে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “যুদ্ধে গিয়েছিলাম। বেঁচে আসব, দেশ দেখব, এটা তখন ভাবনায় ছিল না। আমাদের অনেকে যুদ্ধেই মারা গেছেন। এজন্য আল্লাহর কাছে হাজারও শুকরিয়া আদায় করি যে, স্বাধীন দেশটি আজকে ৫০ বছর ধরে দেখতে পারছি।”

আর যশোরের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা নাজির আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, যতটা কাঙ্ক্ষিত ছিল, বাংলাদেশের অগ্রগতি ততটা হয়নি। এর পেছনে মূল কারণ ‘রাজনৈতিক বিভেদ’।

“আমরা এখন যে অবস্থায় আছি আরও উন্নতি হতে পারত। এটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামগ্রিক। রাজনৈতিক দ্বিধাবিভক্তি ও অসহযোগিতার কারণে এটা হয়নি।… বর্তমান অবস্থায় শেখ হাসিনা যদি ক্ষমতায় না আসতেন, দেশ আরও তলানিতে চলে যেত। তবুও এখন আমরা আশাবাদী। তার হাত দিয়ে অনেক কিছু হয়েছে, আরও হবে।”

মহামারীর বাধা পেরিয়ে উদযাপন

গতবছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি ছিল অনেক। কিন্তু মুজিব বর্ষের উদ্বোধন অনুষ্ঠান স্থগিতের পর করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার ঠেকাতে গোটা দেশকে অবরুদ্ধ করতে হয়। গতবারের স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন হয় সীমিত ব্যাপ্তিতে।

এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সর্বোচ্চ সতর্কতা মেনে সরকার ব্যাপক আয়োজনে সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচি নিয়েছে। ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে ১০ দিনের এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে ১৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে। শুক্রবার স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির দিনে তা শেষ হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে রাজধানীর বিজয় সরণির দুই পাশে নানা ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে রাজধানীর বিজয় সরণির দুই পাশে নানা ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর নেতাদেরও সঙ্গী করেছে বাংলাদেশ। সমাপনী আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

এর আগে বিভিন্ন দিনে অংশ নেন নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারী, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহামেদ সোলিহ, শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং। ভিডিও বার্তা পাঠিয়েও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অনেক রাষ্ট্রনেতা।

শুক্রবার স্বাধীনতা দিবসে ঢাকায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারের থিম ‘স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মহামারীর কারণে সীমিত উপস্থিতির এই অনুষ্ঠানে উন্মোচন হবে সুবর্ণজয়ন্তীর লোগো। ভারতের পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর নেতৃত্বে ‘মৈত্রী’ নামে বিশেষ রাগ পরিবেশিত হবে। বাংলাদেশে উদ্বোধন হবে ‘বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল মিউজিয়াম’।

শুক্রবার প্রত্যুষে ৫০ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচির সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী।

সাধারণ ছুটির এই দিনে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তোলা হয় জাতীয় পতাকা।

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবনের বর্ণিল আলোকসজ্জা। ছবি:  আসিফ মাহমুদ অভি

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবনের বর্ণিল আলোকসজ্জা। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো সুবর্ণজয়ন্তীর বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় গত কয়েক দিন ধরেই চলছে আলোকসজ্জা।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ফেডারেশন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে। সব ক্ষেত্রেই থাকবে মাস্ক পরা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা।

মহানগর, জেলা ও উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হবে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনায় প্রার্থনা। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাক টিকিট প্রকাশ করবে।

দেশের শিশুপার্ক ও জাদুঘরগুলোতে এদিন টিকেট লাগবে না। বিভিন্ন ঘাটে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের জাহাগুলো দুপুর ২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসেও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।