কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের গৃহবধূ শাহিনুর বেগমের (৪৫) টানা দুই মাসের ‘মিশন লিবিয়া’ এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে; সবাই তারিফ করছে এই মায়ের।
শাহিনুরের স্বামী আবুল খায়ের রাজমিস্ত্রির কাজ নিয়ে ২০১৯ সালের শুরুতে লিবিয়ায় যান। তাদের দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ওই বছরের মে মাসে টুরিস্ট ভিসায় একমাত্র ছেলে ইয়াকুব হাসানও (২০) লিবিয়া চলে যান। তিনি বেনগাজিতে একটি তেলের কোম্পানিতে কাজ করতেন। বাবা-ছেলে একসঙ্গেই থাকেন। দুজনের আয়ে পরিবার ভালোই চলছিল।
এর মধ্যে ইয়াকুব আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় ইউরোপে যাওয়ার চিন্তা করেন। প্রথমবার ধরা পড়ে জেলে যান, টাকাও খরচ হয়। আর দ্বিতীয়বার মাফিয়াদের হাতে বন্দি হন। তারপর থেকেই ছেলের চিন্তায় শাহিনুরের নাওয়া-খাওয়া হারাম হয়ে যায়।
শাহিনুর বলছিলেন, “আমার একটাই ছেলে। সাড়ে তিন মাস ছেলের খবর না পেয়ে আমি ঠিকমতো খেতে পারিনি। শুধু কেঁদেছি আর আল্লাহর কাছে ছেলের জীবন ভিক্ষা চেয়েছি। গরু-ছাগল, জমি-জমা বিক্রি করে, বন্ধক রেখে ছেলের মুক্তির জন্য দালালের কাছে টাকা পাঠিয়েছি। সব টাকা দালালরা খেয়ে ফেলেছে। প্রতিবারই তারা টাকা নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।”
“আশপাশের পরিচিতরা সবাই বলছিলেন, আমার ছেলে মারা গেছে। তবে আমার মন বলছিল, ছেলে বেঁচে আছে। এজন্যই সিদ্ধান্ত নেই, ছেলেকে উদ্ধারে নিজেই লিবিয়া যাব। এ কথা শুনে অনেকেই বলছে, আমাকেও মেরে ফেলবে। তারপরও আমি সিদ্ধান্ত নেই লিবিয়া যাব।”
মঙ্গলবার সকালে বাড়ির উঠানে বসে শাহিনুর বেগম যখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এসব কথা বলছিলেন তখন ছেলে ইয়াকুবও পাশে ছিলেন। বন্দি অবস্থায় তার ওপর অনেক নির্যাতন হয়; এখনও তিনি কাহিল, শারীরিকভাবে অসুস্থ।
ইয়াকুব জানান, ২০২১ সালের শুরুতে তিনি সাগর পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ধরা পড়ে ২২ দিন জেল খাটেন। দেড় মাস পর আবার উদ্যোগ নেন। এবার দালালচক্র তাদের প্রায় সাড়ে তিনশ জনকে মাফিয়াদের হাতে তুলে দেয়। অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে বন্দিদের। প্রতিদিনের জন্য বরাদ্দ ছিল একটারও কম রুটি।
এই বন্দিকালে শাহিনুর ছেলেকে উদ্ধারে চার দফায় প্রায় ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন। কিন্তু ছেলেকে ফিরে পাননি। প্রতিবার টাকা নিয়ে দালালরা ফোন বন্ধ করে দিত। ছেলেকে জীবিত ফিরে পেতে শাহিনুরের পরিবারের কাছে আর কোনো বিকল্প ছিল না।
লিবিয়া যাওয়ার সেই ঘটনা তুলে ধরে শাহিনুর বলেন, “মনে সাহস নিয়ে ৮ জানুয়ারি নিজেই চলে যাই লিবিয়ায়। নিজেই পাসপোর্ট করি। পরে মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে ঢাকা যাই। ফকিরাপুলে একজনের মাধ্যমে ভিসা ও বিমানের টিকেটের ব্যবস্থা করি। সব মিলিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হয়।”
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুনো শাহিনুর বলেন, “আমি বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানি না। ছেলে নিখোঁজের খবর পেয়ে লিবিয়ায় থাকা আমার স্বামী দুইবার স্ট্রোক করেন, অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারও অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। আমি একাই ভালোভাবে বেনগাজিতে স্বামীর কাছে পৌঁছাই।”
“স্বামী খুব অসুস্থ। তাকে দেখাশোনার পাশাপাশি ছেলের খোঁজ করতে থাকি। প্রথমে সেখানে বাংলা ভাষা জানেন এমন কয়েকজনকে খুঁজে বের করে তাদের কাছে সব খুলে বলি। তারা আমাকে বাংলাদেশ দূতাবাস ও আইওএম’র (জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা) সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। দূতাবাস ও আইওএম’র কর্মকর্তারা সব শুনে আমাকে সাহায্য করেন।”
“আইওএম কর্মকর্তারা লিবিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইয়াকুবকে উদ্ধার করেন। তারা ফোনে আমার সঙ্গে ওর কথা বলিয়ে দেন। ফোনে যখন ছেলের কণ্ঠ শুনি তখন হাউমাউ করে কেঁদে উঠি। আমার ছেলেও ওপাশ থেকে কান্না করতে থাকে। ছেলেকে দেখার জন্য বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু লিবিয়ায় আমাদের দেখা হয়নি। কারণ ছেলে ছিল ত্রিপলিতে, আর আমি বেনগাজিতে।”
সেদিনের সেই মুহূর্ত স্মরণ করে ইয়াকুব বলেন, “বন্দি হওয়ার চার মাস পর আমাদের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা একজনকে অনেক অনুরোধ করে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার ফোনটি নেই। এরপর বাবার সঙ্গে আমার ১৭ সেকেন্ড কথা হয়। আমি শুধু বাবাকে জায়গার নাম বলি এবং কাউকে আর কোনো টাকা না দেওয়ার জন্য বলি।”
“এরই মধ্যে সব টাকা দালালরা খেয়ে ফেলে। সর্বশেষ দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস পর গত ফেব্রুয়ারিতে একদিন একজন এসে আমার ও আমার বাবার নাম বলেন। আমি তখন তার সঙ্গে কথা বলি, তিনি আমার ছবি তুলে নেন। এর দুদিন পরেই ছাড়া পাই।”
“কখনও ভাবিনি আবার দেশে ফিরে আসতে পারব। আল্লাহর রহমত আর আমার মায়ের জন্য আমি এখন মুক্ত বাতাসে,” বলেন ইয়াকুব।
লিবিয়াতে মা-ছেলের দেখা হয়নি। মা ছিলেন বেনগাজিতে আর ছেলে ত্রিপলি। ৮ মার্চ শাহিনুর বেনগাজি থেকে আর ইয়াকুব ১৬ মার্চ ত্রিপলি থেকে ঢাকায় ফেরেন। দুজনকেই আশকোনার হজ ক্যাম্পে রাখা হয়। সেখানেই তাদের দেখা হয়। ২১ মার্চ মা-ছেলে বাড়ি ফিরে আসেন।
শাহিনুর বলেন, “আমার ছেলে এখনও অসুস্থ। ছেলেকে আর কোথাও যেতে দেব না। সরকার যদি আমাদের টাকাগুলো দালালদের কাছ থেকে উদ্ধার করে দেয় তাহলে আমরা স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারব। কারণ দেনার চাপে আমরা এখন দিশেহারা।”
‘কবরের মতো ঘরে ৩০০ জন, লাশের গন্ধ’
বাবার সঙ্গে বেনগাজিতে ভালোই ছিলেন ইয়াকুব হাসান। বাড়িতে মাও স্বাচ্ছন্দে ছিলেন। অভাব অনেকটাই কেটে গিয়েছিল পরিবারের। এর মধ্যে বন্ধুদের উৎসাহে ও হবিগঞ্জের দালাল জাহাঙ্গীরের খপ্পরে পড়ে ইয়াকুব ইউরোপে যাওয়ার চিন্তা করেন। জাহাঙ্গীরকে চার লাখ টাকা দিয়ে নৌকায় ওঠেন।
ইয়াকুব হাসান বলেন, “প্রথমে গাড়িতে করে বেনগাজি থেকে ত্রিপলিতে নেওয়া হয় আমাকে। ত্রিপলি থেকে আমিসহ আরও কয়েকজনকে নেওয়া হয় প্রায় ১১৫ কিলোমিটার পশ্চিমের জুয়ারা পোর্টে। সেখান থেকে নৌকাযোগে ইতালির ল্যাম্পিদুসা দ্বীপে যাওয়ার কথা ছিল। আর ল্যাম্পিদুসা দ্বীপ থেকে জাহাজে করে ইতালি নেওয়ার কথা।”
“প্রথমবার নৌকাতে ১৫০ জন যাত্রী ছিলেন। তবে নৌকার মাঝির ওয়ারলেস চালু থাকায় যাত্রার শুরুতেই আমাদের নৌকা লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের কাছে ধরা পড়ে। তখন আমাদের আটক করে জেলে পাঠানো হয়। জেলে আমাদের ওপর খুব অত্যাচার করা হতো। খাওয়ার জন্য একটা রুটি আর পানি দিত। ২২ দিন জেলে থাকার পর কোস্ট গার্ডকে চার লাখ টাকা দিয়ে আমি ছাড়া পাই।”
এ ঘটনার দেড় মাস পর একই দালাল জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে আবার ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন ইয়াকুব। এবারের নৌকাটি বড়। লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশ। কিন্তু দালালরা তাদের নিয়ে মাফিয়াদের হাতে তুলে দেয়। মাফিয়ারা তাদের বন্দি করে নিয়ে যায়। মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় সবকিছু কেড়ে নেয়।
ইয়াকুব বলেন, “কবরের মতো ছোট একটি ঘরে আমাদের রাখা হয়। ঘরটিতে কোনো আলো-বাতাস ছিল না, শুধু অন্ধকার। আমাদের প্রতিদিন একবার ঘর থেকে বের করে মারপিট করা হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো প্রতিদিন একটা রুটি। অনেক সময় একটা রুটিও পেতাম না। ভালোভাবে একটু পানিও দেওয়া হতো না।
“প্রায় ৩০০ জনকে একটি রুমে রাখা হয়। প্রায়ই এখানে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে মারা যেতেন। দীর্ঘদিন খাবার না পেয়ে অনেকের পেটের সমস্যা হয়েছিল। অনেকের শরীরে ঘা হয়ে যায়, শরীর থেকে পুঁজ পড়ছিল। আমার পুরো শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘা হয়। তারা কোনো চিকিৎসা বা ওষুধ দিত না। কেউ মারা গেলে লাশগুলোও সরিয়ে নেওয়া হতো না। লাশের পচা গন্ধে সেখানে থাকা দায় ছিল।”
কয়েকজন বাঙালিই অনেক বেশি অত্যাচার করত বলে জানান ইয়াকুব।
তিনি আরও বলেন, “সেখানে সাতজন বাংলাদেশি আমাদের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল। তারা মাফিয়াদের হাতে অনেক আগে ধরা পড়েছিল। তবে তারা মাফিয়াদের কিছুটা বিশ্বস্ত। ওই সাতজন আমাদের নিয়মিত মারত। কোনো কথা ছাড়াই হাতের কাছে যা পেত তাই দিয়ে মারত। তাদের কোনো মায়া-দয়া ছিল না। তারাই আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে।”
“আমাদের ৩০০ জনের জন্য প্রতিদিন ৩০০টি রুটি দেওয়া হতো। এই সাতজন ৫০ থেকে ১০০টি রুটি রেখে বাকিগুলো আমাদের দিত। আমরা সেগুলো ভাগ করে খেতাম।
তিনি বলেন, “বন্দিদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি আর মিশরীয়। এ ছাড়া সুদান, আফ্রিকা, কেনিয়ার অনেকেই ছিলেন। সবার ওপর অত্যাচার করা হতো। অনেকে ওখান থেকে পালিয়ে যান। যারা পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়তেন তাদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করা হতো। অনেককে পিটাতে পিটাতে মেরেই ফেলা হতো। গরম বালুতে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হতো।”