দীঘির চার পাড়ে গড়ে উঠেছে নানা অবকাঠামো। পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ে দীঘির জমিতেই শ’খানেক টিনশেডের স্থাপনা। আছে সেমিপাকা এবং পাকা বাড়িঘরও।
এসব স্থাপনা থেকে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে দীঘির পানিতে। নিয়মিত ফেলা হচ্ছে পলিথিন ও পয়ঃবর্জ্য। শ্যাওলা জমে পানি সবুজ রঙ ধারণ করেছে। ওই পানিতেই চলছে কাপড় ধোয়া।
মাস খানেক আগে দীঘির পানি থেকে দুর্গন্ধ বাড়তে শুরু করে। এখন দুর্গন্ধ এতটাই বেড়েছে, যে আশেপাশের বাসিন্দারাও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।
দীঘির পশ্চিম পাড়ে কথা হয় সাইফুল আলম নামের একজনের সঙ্গে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে পানির গন্ধ খুব বেশি। রোজা রেখে মসজিদে নামাজ পড়তে যাই। গন্ধে টেকা দায়।”
প্রায় এক দশক আগে দীঘিতে কচুরিপানা জমে পুরো ঢেকে গিয়েছিল। তখন কচুরিপানা অপসারণে স্থানীয়দের নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন আসকার দীঘির পাড়ের বাসিন্দা সালেহ জঙ্গী।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন পানির যে অবস্থা তার নমুনা সংগ্রহ করা উচিত। এরকম পানি ব্যবহার করলে নিশ্চিত অসুখ বিসুখ হবে। এই পানি ব্যবহার করে কয়েকজনের চর্মরোগ হয়েছে বলে আমরা জানি।”
পশ্চিম পাড়ের বাসিন্দা আশীষ চৌধুরী বলেন, “আমাদের রান্নাঘরের জানালা দীঘির দিকে। এমন দুর্গন্ধ আসে যে ঘরে থাকা কঠিন। বাইরে গেলেও একই অবস্থা। দীঘির পানি পচে গেছে। রাস্তায় বের হলে নাকে হাত দিয়ে হাঁটতে হয়।
“মাঝে মাঝে গন্ধ এত বেড়ে যায় যে বমি আসে। গত সপ্তাহে বৃষ্টির পর গন্ধ একটু কমেছিল। এখন অতিরিক্ত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।”
প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আছে মোগল ফৌজদার আসকার খাঁ সৈন্যদের ব্যবহারের জন্য আসকার দীঘি খনন করেন। পরে মিথ তৈরি হয়, পরীর পাহাড় (কোর্ট হিল) থেকে পরীরা এই দীঘির স্বচ্ছ পানিতে স্নান করতে আসত।
নগরীতে যে কয়টি প্রাচীন পুকুর-দীঘি টিকে আছে, তার মধ্যে আসকার দীঘি অন্যতম। এই দীঘি স্থান করে নিয়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাসে, গান-কবিতায়।
পরিবেশ আন্দোলনে যুক্ত হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসকার দীঘির পানির নমুনা নিয়ে মাস খানেক আগেও পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ পাওয়া গেছে লিটারে দশমিক ৫ মিলিগ্রাম। অথচ ডিও থাকার কথা লিটারে ৫ মিলিগ্রাম।
“ডিও কমে গেলে পানিতে অনুজীবগুলো মরে যায়। ফলে মাছ বা অন্য প্রাণি বাঁচে না। এই দীঘির পানিতে অর্গানকি (পঁচনশীল আবর্জনা) দূষণ থাকায় ডিও এভাবে কমেছে। কারণ পঁচনশীল পদার্থ অক্সিজনকে টেনে নেয়।”
পানিতে অম্ল ও ক্ষারের ভারসাম্যের পরিমাণ কমে গেছে জানিয়ে ইদ্রিস আলী বলেন, “দূষণের মাত্রা বেশি হলে পানির রঙ বদলে যায়। পানি থেকে গন্ধ হয়। একেই সাধারণভাবে বলা হয় পানি পচে গেছে।
“এই পানিতে পিএইচ (পানিতে অম্ল ও ক্ষারের অনুপাত) কমে অম্লীয় হয়ে গেছে। ব্যবহার করলে চুলকানিসহ নানা রকম চর্ম রোগ হবে।”
দূষণ রোধে আগে সব আবর্জনা তুলে দীঘি পরিষ্কার করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “এতে আর আবর্জনা ফেলা যাবে না। এরপর পুরনো পানি সরাতে হবে। নতুন পানি দিতে হবে।”
দীঘির পূর্ব পাড়ের এক বাসিন্দা বলেন, “পূর্ব পাড়ের অনেক বাড়িঘরের সুয়ারেজ পাইপ লাইন মাটির নিচে দিয়ে দীঘির ভেতরে দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে পলিথিন।
“দীঘিতে স্থানীয়রা প্রতিদিন পলিথিনে করে গৃহস্থলী আবর্জনা, ফলের খোসাসহ নানা রকম ময়লা ফেলে। এতে দীঘি মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে।”
স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে আসকার দীঘির আবর্জনা অপসারণে উদ্যোগ নিয়েছেন জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন।
বুধবার থেকে আবর্জনা অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “দীঘিটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। আশেপাশের বস্তি থেকে নিয়মিত দীঘিতে ময়লা আবর্জনা সব ফেলা হয়।
“দীঘির মালিক পক্ষকে বলে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করেছি। তারা কাজ শুরু করেছে। আবর্জনা সরানোর পর প্রথমে গোবর, এরপর ফিটকিরি, ব্লিচিং পাউডার দেওয়া হবে।”
শৈবাল বলেন, দীঘির পানি পুরো স্থির, তাই মোটরের সহায়তায় পানিতে ঢেউ দেওয়া হবে। আগেও একবার পরিষ্কার করা হয়েছিল। মালিকপক্ষ পরিষ্কার করার পর সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরাও কাজ করবে।
আসকার দীঘির বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দীঘিটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। এ বিষয়ে স্থানীয়রা কেউ অভিযোগ করলে পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কয়েক হাত ঘুরে দীঘিটির মালিক বর্তমানে ফিনলে প্রপার্টিজের পরিচালক ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরী। তার পক্ষে ব্যবস্থাপক মো. শাহাবুদ্দিন দীঘিটি দেখাশোনা করেন।
ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকা মো. শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েস সভাপতি শরীফ চৌহান বলেন, “নগরীতে জলাশয় এখন হাতে গোনা। এগুলো পরিস্কার ও দখলমুক্ত রাখতে সরকারি সংস্থাগুলোর কোনো উদ্যোগ নেই।
“আসকার দীঘির পচা পানির দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ। আবর্জনা ভরা পানিতে গোসল, গৃহস্থলী কাজসহ সবকিছু চলছে, যা রোগ ছড়াতে পারে। আসকার দীঘিকে পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি।”
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এখন মালিকপক্ষের লোকজন পরিষ্কার করছে। ঈদের পর সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মীদের নিয়ে কাজ শুরু করব।