ক্যাটাগরি

মাসিক স্বাস্থ্য: স্কুলে যা শেখায়, সন্তুষ্ট নয় যুক্তরাজ্যের তরুণরা

“আমি তো পিরিয়ড নিয়ে
যা জানি তার বেশির ভাগই জেনেছি টিকটক থেকে”, বললেন ১৮ বছর বয়সী ইফা আনগারাড।

ওয়েলসের কারমার্টেনশায়ারের গোরস্লাসের
গ্রামের এই তরুণী বলেন, “পিরিয়ড নিয়ে শিক্ষার মান ভয়ানক খারাপ।”

স্কুলে মাসিক নিয়ে
পাঠদান যে জরুরি, ওয়েলসের সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির এক গবেষণাতেও তা উঠে এসেছে। 

বিবিসির এক
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়েলস সরকার ইতোমধ্যে নতুন পাঠ্যসূচিতে পিরিয়ড নিয়ে শিক্ষা
বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের অন্যান্য অংশেও এ বিষয়ে পদক্ষেপ
নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

শ্রেণিকক্ষের এক অভিজ্ঞতা মনে করে ইফা
বিবিসিকে বলেন, প্রাথমিক স্কুলের শেষ বছর ক্লাসে বয়ঃসন্ধি নিয়ে পড়ানো হচ্ছিল;
শেষের দিকে ছেলেদের ক্লাস থেকে বার করে দেওয়া হল। 

“তারপর
আমাদের বলা হল, ও হ্যাঁ, তোমাদের এক সময় মাসে তিন থেকে আট দিনের জন্য রক্তপাত
হবে।”

এই তরুণী হতাশার সুরে বলেন, “কেন পিরিয়ড হয়,
মাসিকের আগে ও পরে উপসর্গ অথবা হরমোনের পরিবর্তন নিয়ে কোনোকিছুই শেখানো হয়নি
আমাদের।”

ইফা আনগারাড এবং তার
এক বন্ধু এরপর অনলাইন থেকেই মাসিক নিয়ে জানতে পারেন শ্রেণিকক্ষের চেয়েও অনেক বেশি।

“আমার তো মনে হয়, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পদ্ধতি
আমার মায়ের সময় থেকে খুব বেশি বদলায়নি।”

মাসিক কেন হয়- এ প্রশ্নের কোনো উত্তর শ্রেণিকক্ষ থেকে পাননি
বলে জানালেন ১৭ বছর বয়সী লিলি মাই।

তিনি বলেন, “কোনো গভীর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নেই, আমরা মাসিকের
দিনের ব্যথা ও পেট কামড়ানো নিয়ে কোনো আলাপ করলাম না। মনে হচ্ছিল যেন আমি একাই গিয়েছি
সেখানে।”

আমানফোর্ড শহরে থাকেন ফিওন। তার বয়স ১৭।
শ্রেণিকক্ষে মাসিক নিয়ে পড়ানো হয়েছে এমন কিছু তিনি খুব একটা মনে করতে পারেন না।

ফিওন বলেন, “আমাদের ট্যাম্পুন, মেন্সট্রুয়াল
কাপ নিয়ে কিছুই শেখানো হয়নি। খুবই সাধারণ কিছু কথা বলা হয়েছিল। আর যখন আমার মাসিক
শুরু হল, তখন বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছিল, কারণ আগে থেকে ভালো ধারণা আমি পাইনি।”

নাটালি ব্রাউন কাজ করেন নারী খেলোয়াড়দের
সঙ্গে। পিরিয়ডের কারণে তাদের শরীর কেমন থাকে এবং ওই সময় তারা খেলায় কতটুকু মনোযোগ
দিতে পারেন এসব দেখভাল করতে হয় তাকে।

সরকারি ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্পোর্টস
ওয়েলসের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির ওই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন
নাটালি। তিনিও মনে করেন, স্কুলে এসব বিষয়ে খুব সামান্যই শেখানো হয়।

ওই জরিপে অংশ নেওয়া ৯০ শতাংশ শিক্ষক ছিলেন
নারী এবং তারা বেশিরভাগ সময় নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলেছেন।

ওই গবেষণামূলক প্রতিবেদনে মাসিক নিয়ে শিক্ষকদের
আরও সময়, প্রশিক্ষণ এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে আবেগ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় রেখে
নিয়মিত আরও তথ্য দিয়ে সহায়তার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

‘মেয়েদের পাশে থাকতে হবে’

শিক্ষকরা এও দেখেছেন, মাসিকের কারণে শ্রেণিকক্ষে
ও শরীরচর্চায় মেয়েদের উপস্থিতি কমে গেছে; আচরণে বদলের সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাসেও ঘাটতি
দেখা গেছে।

নাটালি বলেন, “ঠিক এখানেই আমাদের মেয়েদের পাশে থাকতে হবে।
কারণ মাসিকের কারণে তাদের পড়ালেখা, পরীক্ষায় ফলেও ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।”

ক্যাথরিন কিং একটি সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা
করে আসছেন যার নাম ব্লাডি অনেস্ট।

মাসিক নিয়ে জানার যে ঘাটতি রয়েছে, তা মেটানোই তার মূল
উদ্দেশ্য বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন তিনি।

নিজের একেকটি ভিডিও পোস্টে কিং যত মন্তব্য পান, তা
থেকে তিনি বুঝতে পারেন, মাসিক নিয়ে জানতে কতটা ব্যাকুলতা কাজ করছে মেয়েদের
মধ্যে।   

ক্যাথরিন কিং বলেন, “একটা প্রশ্ন বারবার অনেকেই করেন আমাকে, আমার জননাঙ্গ কোথায়?

“আমি
সত্যি অবাক হই। মাসিক নিয়ে জানায় এতটা ঘাটতি রয়েছে আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।
যদি বন্ধু বা পরিবার থেকে কিছু ধারণা তারা পেয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে তাদের ভাগ্য
ভালো। কিন্তু যদি সে সুযোগ না থাকে, তাহলে এভাবে ইন্টারনেট থেকে অপরিচিত কারো কাছ
থেকেই জানতে হবে।”

২৬
বছর বয়সী ক্যাথরিন কিংয়ের কোনো মেডিকেল
প্রশিক্ষণ নেই। তার বয়স যখন ২০, সে সময়ে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি
অন্যদের যতটা সম্ভব জানানোর কাজে হাত দেন।  

“আপনি যত জানবেন, তত বুঝতে পারবেন নিজের
ভেতরে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না। তত দ্রুত আপনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারবেন,
পরীক্ষা করতে পারবেন এবং বুঝতে পারবেন জীবন বদলে যাচ্ছে।”

পাঠ্যসূচিতে কী আছে?

ওয়েলস সরকার বলছে, নতুন পাঠ্যসূচি চালু হলে শিক্ষকরা
স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারবেন।

“মাসিক সুস্থতা নিয়ে শিক্ষা দেওয়া কেবল একটি
অধ্যায়ে সম্ভব নয়, তাই রিলেশনশিপস অ্যান্ড সেক্সুয়ালিটি এডুকেশন – আরএসই নামে একটি কোড যোগ করা হয়েছে; যার পাঠ
দেওয়া হবে বিভিন্ন ধাপে।”

নর্দান আয়ারল্যান্ডে প্রাথমিক এবং এর ওপরের শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানে মাসিক নিয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানাচ্ছে সেখানকার সরকার।

“শিক্ষার্থীরা এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানতে
পারবে এবং এ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করারও সুযোগ থাকছে। এতে করে মাসিক নিয়ে সাধারণ
যেসব কুসংস্কার রয়েছে, তা ভেঙে যাবে। এ নিয়ে নেতিবাচক আচরণেও বদল আসবে।”

যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, ইংল্যান্ডের
শিক্ষার্থীদেরও মাসিক ও মাসিকের দিনে শারীরিক-মানসিক প্রভাব নিয়ে জানতে হবে; এটি
পাঠ্যসূচিতে অত্যাবশ্যকীয় অধ্যায়।