সোমবার তিনি চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করলে বিচারক মুন্সী আব্দুল মজিদ তা নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
দুদকের করা এ মামলায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর প্রদীপ ও চুমকির বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত প্রদীপ কারাগারে থাকলেও তার স্ত্রী এতদিন পলাতক ছিলেন।
অবৈধ সম্পদ অজর্নের অভিযোগে বরখাস্ত ওসি প্রদীপ ও তার স্ত্রী চুমকির বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে ২০২০ সালের ২৩ আগস্ট। এর আগে ৩১ জুলাই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওসি প্রদীপকে গ্রেপ্তারের পর প্রদীপের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে দুদক।
কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ এর সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন ওসি প্রদীপের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করেন, তিনিই বাদী হয়ে মামলাটি করেছিলেন।
ওই মামলায় এই দম্পতির বিরুদ্ধে তিন কোটি ৯৫ লাখ পাঁচ হাজার ৬৩৫ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
‘ঘুষ-দুর্নীতির‘ অর্থে কীভাবে প্রদীপ তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন সম্পদ গড়েছেন, তা বলা হয় মামলার এজাহারে। বলা হয়, প্রদীপ তার স্ত্রীকে কমিশন ব্যবসায়ী ও মৎস্য ব্যবসায়ী সাজিয়ে ‘অবৈধ সম্পদ বৈধ’ করার চেষ্টা করেছেন।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, প্রদীপ ‘ঘুষ ও দুর্নীতির’ মাধ্যমে অর্জিত অর্থ গোপন করার জন্য চট্টগ্রামের পাথরঘাটা এলাকায় ওই ছয়তলা বাড়ি করেন তার শ্বশুরের নামে। পরে তার শ্বশুর ওই বাড়ি তার মেয়ে চুমকিকে দান করেছেন বলে দেখানো হয়।
আয়কর রির্টানে চুমকি কারণের কমিশন ব্যবসা এবং বোয়ালখালী উপজেলায় ১০ বছরের জন্য লিজ নেওয়া পাঁচটি পুকুরে মাছের ব্যবসার যে আয় দেখানো হয়েছে, তাও স্বামী প্রদীপ দাশের ‘জ্ঞাত আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে অর্জনের পর স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে দেখানো ভুয়া ব্যবসা’ বলে মনে করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
দুদকের আইনজীবী মাহমুদুল বলেন, “মাছ চাষের ব্যবসার যে হিসেব দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই বলে দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে।”
মামলা দায়েরের পরের বছর ২০২১ সালের ২৮ জুলাই দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন, আদালতে মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সম্পদ বিবরণীতে ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার ৯৫৭ টাকা সম্পদের তথ্য গোপন করে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং ২ কোটি ৩৫ লাখ ৯৮ হাজার ৪১৭ টাকার জ্ঞাত আয় বর্হিভূত অর্জন ও অন্যকে হস্তান্তরের অভিযোগ আনা হয় দুদকের দাখিল করা অভিযোগপত্রে।
আইনজীবী মাহমুদুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, “ওসি প্রদীপ ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে যে সম্পদ অর্জন করেছেন তা স্ত্রী ও শ্বশুরের নামে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও ভোগ দখলে রেখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।”
অভিযোগপত্রে যেসব সম্পদের উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হল- নগরীর পাথরঘাটায় একটি ছয়তলা বাড়ি, ষোলশহরে সেমিপাকা ঘর, ৪৫ ভরি সোনার গয়না, একটি করে কার ও মাইক্রোবাস এবং কক্সবাজারে ফ্ল্যাট।
একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর মামলায় অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত।
এর পর ১৫ ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত অভিযোগ গঠন করে প্রদীপ ও চুমকির বিচার শুরুর আদেশ দেয়। এবং দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে অভিযোগ গঠনের দিনই পলাতক চুমকিকে গ্রেপ্তারেও পরোয়ানা জারি করে আদালত।
মামলায় মোট ২৯ জনকে সাক্ষী করা হয়। চুমকির বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ মুন্সী আব্দুল মজিদের আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর তিনমাসের বেশি সময় পর এদিন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন চুমকি।
তবে এই মামলায় প্রদীপের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিপরীতে উচ্চ আদালতে করা একটি আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।
এর আগে গত ২৯ জুন দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রদীপ কুমার দাশ ও তার স্ত্রী চুমকি কারণের জব্দ করা সম্পত্তি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ডিসির জিম্মায় থাকবে বলে আদেশ দেয় আদালত।
কক্সবাজারের টেকনাফের কাছে বাহারছড়া চেকপোস্টে গত ৩১ জুলাই রাতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।
ওই ঘটনার পর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস গত ৫ অগাস্ট কক্সবাজারের হাকিম আদালতে ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেখানে বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলিকে ১ নম্বর এবং টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে ২ নম্বর আসামি করা হয়।
মামলা হওয়ার পর ওসি প্রদীপসহ সাত পুলিশ সদস্য ৬ অগাস্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর প্রদীপকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর হত্যা মামলায় ১৫ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয় র্যাব। গত ২৭ জুন কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রদীপসহ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়।
সিনহা হত্যা মামলায় গত ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজার জেলা আদালতের দেওয়া রায়ে পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত।