তবে আইন মেনে ভাটা পরিচালনা করছেন বলে
দাবি ভাটা মালিকদের।
অপরদিকে নদী দখলকারী ও অবৈধভাবে ভাটা
স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলছে জেলা প্রশাসন।
খুলনা জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, জেলায়
লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইটভাটা ১৫৩টি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর এসব ভাটার রেজিস্ট্রেশন নবায়ন
করতে হয়। সেক্ষেত্রে অনেকে নবায়ন করেন, অনেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে পারেন না।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার রূপসা উপজেলার
আঠারোবেকী, বটিয়াঘাটার কাজিবাছা, পাইকগাছার শিপসা, কয়রার কপোতাক্ষ, ডুমুরিয়ার ভদ্রা,
হরি, ঘ্যাংরাইলসহ বিভিন্ন নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে এসব ভাটা।
এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ডুমুরিয়ার
হরি ও ভদ্রা নদীর। এখানকার ভাটাগুলো নদীর পশ্চিমপাশে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে
রয়েছে; নদীর ভেতরে অর্ধেক জায়গা দখল করেছে।
কেবি ব্রিকস নামের একটি ইটভাটা ভদ্রা
নদীর সীমানা নির্ধারণকারী পিলার থেকে আরও ভেতরে ইট-সুরকি ও বালু দিয়ে নদী ভরাট করে
দখলে নিয়েছে। একইভাবে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে আরও ১৭টি ইটভাটা।
কেবি ব্রিকসের মালিক ও ডুমুরিয়া সদর ইউপি
চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির বুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেশিরভাগ জমিই স্থানীয়
মালিকদের কাছ থেকে নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করে নেওয়া হয়েছে। আর কিছু জমি পানি
উন্নয়ন বোর্ডের। সেখানে আমরা শুধুমাত্র মাটি কেটে ফেলে রাখি।”
পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের কোনো
অনুমোদন আছে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সবকিছুর অনুমোদন নিয়েই ইটভাটা পরিচালনা
করছি।”
কৃষিজমিতে কীভাবে অনুমোদন পেলেন জানতে
চাইলে তিনি বলেন, “২০ বছর আগে থেকে এই ভাটার কার্যক্রম চলে আসছে।”
ডুমুরিয়া সদরের স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম
মোস্তফা বলেন, নদী দখলের পর ভাটা মালিকরা নদীতে বাঁধ দিয়ে ছোটো ছোটো পুকুর নির্মাণ
করেছেন। এসব পুকুরে জমা পলিমাটি দিয়েই তারা ইট তৈরি করছেন।
তিনি বলেন, এভাবে বাঁধ দেওয়ায় নদীর স্রোত
কমে যাচ্ছে। পলি পড়ে নদী নাব্যতা হারাচ্ছে, পাল্টে যাচ্ছে গতিপথ। আবার কোথাও নদী প্রায়
মরে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে সেতু ও বাজার। পানি নিষ্কাশনসহ নৌ-চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।
মোস্তফা আরও বলেন, নদীর পাড়ের এ জমি ভূমিহীন
কৃষকরা সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছিলেন। সেইজমি ইটভাটার মালিকরা নানা কৌশলে দখলে
নিয়ে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত জমি মিলিয়ে ২০০৯ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে ১৮টি ভাটা গড়ে তুলেছেন।
“এর অধিকাংশ ভাটা বসতবাড়ির ১০ থেকে ১০০
গজের মধ্যে। বসতবাড়ির কাছে হওয়ায় ভাটার ধোঁয়া-বালিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন বাসিন্দারা।”
একই ইউনিয়নের খর্নিয়া এলাকার কৃষক আব্দুল
মজিদ জানান, ভাটার ধুলা আর কালি ফসলি জমিতে পড়ায় শোভনা, কুলবাড়িয়া, ভদ্রদিয়া, খর্নিয়া,
রানাই, চহেরা, শোলগাতিয়া এলাকার কৃষি জমিতে আবাদে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফসল উৎপাদনও কমে গেছে।
এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইটভাটার জন্য
কৃষি জমির মাটি আনা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
স্থানীয় নারীনেত্রী রোজিনা পারভীন বিডিনিউজ
টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নদীর অববাহিকায় প্রায় ১৩ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা
ফিরিয়ে আনতে নদী খননসহ অবৈধ দখল নেওয়া নদী-খালে আড়াআড়ি বাঁধ ও নেট-পাটা উচ্ছেদের বিকল্প
নেই।
তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড পলি অপসারণের
জন্য ২০০৮ সালে হরি নদীতে ড্রেজিং শুরু করে; কিন্তু সেটি প্রভাবশালীমহলের কারণে বন্ধ
হয়ে যায়।
আটলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রতাপ রায় বলেন,
নদী-খাল দখল করে নির্মিত ইটভাটা মালিকরা স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাবান।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোছাদ্দেক
হোসেন বলেন, ইটভাটা থেকে যে দূষিত গ্যাস ও তাপ নির্গত হয় তা আশপাশের জীবজন্তু, গাছপালা
ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। ভাটার চিমনি দিয়ে বের হওয়া ধোঁয়ার তেজস্ক্রিয়তায় এলাকায়
গাছের পাতা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কার্বন পড়ায় পাতার খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়। আম, লিচু,
নারিকেল প্রভৃতি গাছের ফুলের পরাগায়নেও বিরূপ প্রভাব পড়ে।
মোছাদ্দেক বলেন, ২০১৩ সালের ইটপ্রস্তুত
ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী আবাসিক এলাকা ও কৃষিজমির ওপর ইটভাটা স্থাপন
নিষিদ্ধ।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক
আব্দুল লতিফ জমাদ্দার বলেন, “ইটভাটা সরকারি জমির মধ্যে পড়লে সরকার নিয়ে নিলে আমাদের
আপত্তি নেই।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোর অঞ্চলের (খুলনা,
যশোর ও নড়াইল জেলা) প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, নদী দখল করে ইটভাটা স্থাপনকারীদের
বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক
সাইফুর রহমান খান বলেন, “পরিবেশ আইনের আওতায় যদি সঠিক থাকে, তাহলে সেই ইটভাটার অনুমোদন
দিয়ে থাকি। তবে নদী দখল করে ভাটা থাকলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ।”
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল
ওয়াদুদ বলেন, নদী সংস্কার সরকারের অগ্রাধিকারমূলক বিবেচনায় রয়েছে। সম্প্রতি ওই ইটভাটাগুলোর
সীমানা নির্ধারণ করে লাল কাপড় দিয়ে খুঁটি গেড়ে দেওয়া হয়েছে।
“অবৈধ ইটভাটার মধ্যে থাকা সরকারি জমি
উদ্ধার এবং নদী-খালের আড়াআড়ি বাঁধ ও নেটপাটা উচ্ছেদের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।”
খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন
বলেন, যারা নদী দখল করছে বা অবৈধভাবে ভাটা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা
নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ওই এলাকায় আট লাখ টাকা জরিমানার
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী
বেগম হাবিবুন্নাহার বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন তৎপর হলেই অবৈধভাবে কেউ নদী
দখল করে ইটভাটা স্থাপন করতে পারবে না। ঢাকায় যদি নদীদখলমুক্ত করা যায়, তবে খুলনায় কেন
যাবে না!”