ক্যাটাগরি

মহামারীতে রপ্তানি বন্ধে নওগাঁর শুঁটকিতে মন্দা

তবে
করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে দেশে এবং রপ্তানি বাজারে বিক্রি কমে যাওয়ায় লোকসানের
শঙ্কায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন শতাধিক শুঁটকি মাছ ব্যবসায়ী।

আত্রাই
উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে আত্রাই নদী। এখানে রয়েছে প্রায় অর্ধশত বিল। পাশের রাণীনগর উপজেলাও বহু
বিল রয়েছে যেখানে প্রচুর ছোটো মাছ পাওয়া যায়। এখানকার মাছ থেকে এসব শুঁটকি উৎপাদিত
হয়।

মৎস্য
বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় পুঁটি, চান্দা, মলা, খলিশা, দেশি চিংড়ি, টাংড়া, পাতাশীসহ
নানা প্রজাতির মাছের শুঁটকি হয়।

শুঁটকি
মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, আত্রাই রেলস্টেশন সংলগ্ন ভরতেঁতুলিয়া গ্রাম শুঁটকির গ্রাম হিসেবে
খ্যাত। এখানে উৎপাদিত দেশি প্রজাতির মিঠা পানির ছোটো মাছের শুঁটকি দেশের বিভিন্ন
স্থানে চালান হয়। চলতি বছরে চারবারের বন্যায় আত্রাইয়ের বাজারগুলোতে পর্যাপ্ত ছোটো
মাছের আমদানি হওয়ায় বর্তমানে শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শুঁটকি পল্লির
বাসিন্দারা।

আত্রাই
রেল স্টেশনে ঢুকলেই রেল লাইনের দুই পাশ দিয়ে চোখে পড়বে শুঁটকির মাছ শুকানোর মাচাং।
শুঁটকির গন্ধ চারিদিকে।

ব্যবসায়ীরা
আরও জানান, এখানকার শুঁটকির বাজার মূলত দেশের উত্তরের জেলা রংপুর, নীলফামারী,
লালমনিরহাট, জামালপুর ও ঢাকায়। তবে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে
রপ্তানিও হয়।

তেঁতুলিয়া
গ্রামের শুঁটকি মাছ ব্যবসায়ী রামপদ শীল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চলতি
মৌসুমে কাঁচা মাছের আমদানি অনেক বেশি হলেও ভারতে এই মাছ রপ্তানি না হওয়ার কারণে কম
দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবুও এবার ভালো লাভের আশা করা হচ্ছে। যদি ভারত এই মাছ
আমদানি শুরু করে তাহলে শুঁটকি মাছ ব্যবসায়ীরা এই মৌসুমে কিছুটা লাভবান হতে পারবেন।

করোনাভাইরাস
মহামারীর কারণে ভারতে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে বলে তিনি জানান।

মিরাট
গ্রামের ব্যবসায়ী রহিম উদ্দিন বলেন, “বর্তমানে পুঁটি, বাটা, আইকোর, চান্দা, শাটি,
খলিশাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোটো মাছের শুঁটকি প্রতি কেজি গড়ে একশ থেকে দুইশ টাকা
বিক্রি হচ্ছে। যদি ভারতে এই শুঁটকি রপ্তানি হতো তাহলে আমরা দ্বিগুণ দাম পেতাম।”

শুঁটকির
মাছ তৈরি করা অনেক কঠিন একটা কাজ বলে জানান তিনি।

আত্রাইয়ের
শুঁটকি শ্রমিক হালিমা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই শুঁটকি মাছ
তৈরির কাজ করে কোনোমতে পরিবার চলছে। কিন্তু বছরের ৬ মাস আমাদের বসে থাকতে হয়। তখন
কাজকর্ম না থাকার কারণে অনেকটাই খেয়ে-না খেয়ে দিন পার করতে হয়। তাই তখন সরকারের
পক্ষ থেকে আর্থিক কিংবা খাদ্য সহায়তা পেলে আমরা অনেক উপকৃত হতাম।”

নওগাঁ
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ জানান, গত বছর জেলায় ৬৫৭ মেট্রিক টন শুঁটকি
উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আত্রাই উপজেলায় ৬শ মেট্রিক টন, নওগাঁ সদরে ১৫
মেট্রিক টন, মহাদেবপুরে ৫০০ কেজি, নিয়ামতপুরে ৫০০ কেজি ও পোরশায় ৩৭ মেট্রিক টন।


মৎস্য কর্মকর্তা জানান, চলতি মৌসুমে প্রায় আট কোটি টাকার শুঁটকি বিক্রির
লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছর মাছের উৎপাদন বেশি, তাই শুঁটকির পরিমাণও
বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই
পেশায় তিন হাজার মানুষ জড়িত বলে জানান ফিরোজ আহমেদ।

নওগাঁ জেলায়
শুঁটকি উৎপাদনের পরিমাণ জানাতে পারলেও বছরে কী পরিমাণ শুঁটকি ভারতে কিংবা দেশের
বিভিন্ন জেলায় যায় সে সম্পর্কিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি ফিরোজ।

আত্রাই
উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ চন্দ্র দেবনাথ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,
“শুঁটকির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শুঁটকির মাছ তৈরির প্রশিক্ষণের
ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা আগে নদীর পানি দিয়ে মাছ পরিষ্কার করত। তাদের দাবি
অনুযায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুঁটকির মাছ পরিষ্কার করার জন্য বিশুদ্ধ পানির
ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

তবে
একটি নির্দিষ্ট খাস জমিতে যদি সরকার একটি শুঁটকি পল্লি নির্মাণ করার পদক্ষেপ নেয় তাহলে
হয়তো আত্রাইয়ের এই শিল্পটি আরও বিকশিত হতো বলে তিনি মনে করেন।

ভবিষ্যতে
সরকার এই শুঁটকি পল্লিতে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব হিসেবে আয় করতে পারবে উল্লেখ করে এই
শিল্পটিকে আরও আধুনিকায়ন করার জন্য সরকারের দ্রুত সুদৃষ্টি কামনা করেন পলাশ চন্দ্র
দেবনাথ।

আত্রাইয়ের
ভরতেঁতুলিয়া শুঁটকি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল জব্বার জানান, আত্রাইয়ে
বড়ো শুঁটকি ব্যবসায়ী ২৫ জন। গত বছর শুঁটকির দাম ভালো ছিল। এ বছর করোনাভাইরাসের
কারণে দেশের হাটবাজার ও ভারতে রপ্তানি মূল্য অনেক কম।

“এবার
শুঁটকির উৎপাদন বেশি, তবে দাম কম। প্রতি কেজিতে শুঁটকির মূল্য কমেছে প্রকার ভেদে
একশ থেকে দেড়শ টাকা।”

গত বছর
প্রায় কোটি টাকার শুঁটকি বিক্রি করেছেন; এবছর ব্যবসা অনেক মন্দা বলে জানান এই
ব্যবসায়ী।

আব্দুল
জব্বার জানান, মোট উৎপাদিত শুঁটকির ৬০/৭০ ভাগ ভারতে রপ্তানি হয়ে থাকে। বাকিটা
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়।

রপ্তানির
বিষয়ে তিনি বলেন, আত্রাইয়ের ব্যবসায়ীরা নীলফামারীর সৈয়দপুরে আড়তদারদের কাছে শুঁটকি
বিক্রি করেন। আড়তদাররা ভারতে সেই শুঁটকি রপ্তানি করেন।

ভরতেঁতুলিয়া
শুঁটকি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক 
রামপদ শীল বলেন, গত বছর পুঁটি, চান্দা, মলা, খলিশা, ব্যালাসহ নানা মাছের শুঁটকি
বিক্রি হয়েছে দেড় থেকে ৩শ টাকা কেজি দরে। শোল, বোয়াল, দেশি চিংড়ি, টাংড়া, অন্যান্য
শুটকি ৫শ থেকে ৬শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

“গত
বছর জেলায় শুঁটকির মোট কেনাবেচা ছিল প্রায় ১০ কোটি টাকা। কিন্তু এবছর মাছের উৎপাদন
বেশি হলেও শুঁটকির মূল্য প্রতি কেজিতে ১শ থেকে দেড়শ টাকা কমেছে।”

তাই এবছর
বেচাকেনা অনেক কম হবে বলেও জানান রামপদ শীল।

তিনি বলেন,
এখানকার শুঁটকি ভারতেও রপ্তানি হয়ে থাকে। করোনার কারনে গত বছরের তুলনায় রপ্তানি মূল্যও
কেজিতে প্রায় ৫০ থেকে ১শ টাকা কমেছে। এছাড়া দেশের ভেতর নীলফামারী, ঢাকা, সিলেট, হবিগঞ্জ
ব্রাঞ্জণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়ে থাকে।

তিনি বলেন,
গত বছর তিনি ২ হাজার মন শুঁটকি দেশে-বিদেশে বিক্রি করেছেন। এ বছর বেচাকেনা খুব
খারাপ। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হয়ে পড়েছে।

জেলা
মৎস্য কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ জানান, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভারতে শুঁটকি
রপ্তানি ফের শুরু হয়েছে। তবে করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের তুলনায় রপ্তানি মূল্যও
কেজিতে ৫০ থেকে ১শ টাকা কমেছে।

ফিরোজ
আহমেদ নওগাঁর আত্রাইসহ গোটা জেলায় শুঁটকি উৎপাদনের পরিমাণ জানাতে পারলেও বছরে কী
পরিমাণ শুঁটকি ভারতে রপ্তানি হয় তার কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।

এই প্রসঙ্গে
নওগাঁ জেলা প্রশাসক হারুন অর রশিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নওগাঁ থেকে কী
পরিমাণ শুঁটকি বিদেশে রপ্তানি হয় তার কোনো হিসাব জেলা প্রশাসনের কাছে নেই।

তবে
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে কথা বলে শুঁটকি বিষয়ক
সকল তথ্য সংরক্ষণ এবং ব্যবসায়ীদেরও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে
তিনি জানান।