ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার আয়োজিত
আলোচনা সভায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
মহামারী মোকাবেলায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ভূমিকার
প্রশংসা করে তিনি বলেন, “তোমরা যে কাজগুলো করে গেছ, তার জন্য সব সময় আমরা সাধুবাদ জানাই।
“আমি জানি হয়ত ক্ষেত্রবিশেষে কোথাও কোথাও দুই-একটা
ঘটনা ঘটে। আর আমাদের কিছু পত্র-পত্রিকা আছে, যতই ভালো কাজ কর, সেটা লেখার তাদের যোগ্যতা
নেই। যদি কোথাও এতটুকু খুঁত পায়, সেটিকে বড় করে লিখতে পারে। এটা তাদের মন-মানসিকতার
দৈন্য বলেই আমি মনে করি। কাজেই ওগুলো আমি বেশি একটা হিসেবে ধরি না।”
তিনি বলেন, “আমি দেখি যে বৃক্ষরোপণ করা, ধান কেটে
কৃষককে সহযোগিতা করা বা করোনাভাইরাসের সময়ে আক্রান্ত রোগী এবং যারা মৃত্যুবরণ করেছে
তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সাহায্য করা, ঘরে ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া, যখন ঝড় আসল, সেই
ঝড়ের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এই যে মানুষের সেবার জন্য যেই কাজগুলো করে যাচ্ছ,
সেটাই হচ্ছে বড় কাজ।”
করোনাভাইরাস সঙ্কটে ত্রাণ নিয়ে নিরন্নের পাশে ছাত্রলীগ
কৃষকের ধান কেটে দিচ্ছে ছাত্রলীগ
মহামারীকালে মজুর সঙ্কটে কৃষকের ধান কেটে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা (ফাইল ছবি)
মহামারী মোকাবেলায় কোনো কাজকে অবহেলা না করে বা
ছোট মনে না করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কৃষকদের ধান কাটতে এগিয়ে আসায় তাদের প্রশংসা
করেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, “যে কৃষক মানুষের খাবারের জন্য ফসল ফলায়
তারা অবহেলার পাত্র না, বরং তাদের সম্মান অনেক বড়। আজকে যখন তোমরা ধান কেটেছ ছাত্রলীগের
ছেলেরা, এটাই প্রমাণ হয়েছে যে, কোনো কাজকে তোমরা ছোট করে দেখ নাই। আমি আবারও বলব, যখনই
নিজের গ্রামে যাবে নিজের দেশে যাবে কাউকে ছোট করে দেখবে না। কোনো কাজকে ছোট করে দেখবে
না। সব কাজেরই গুরুত্ব আছে। সব কাজেরই মূল্য আছে।”
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন,
“বড় সে হতে পারে যে নিজেকে ছোট করে দেখতে পারে। আর উপর দিকে তাকিয়ে চলতে গেলে হোঁচট
খেতে হয়। সেজন্য মাটির দিকে তাকিয়ে চলতে হয়। এটা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, বাবা-মা শিক্ষা
দিয়েছেন। দাদা-দাদি শিক্ষা দিয়েছেন। সেই কথাটা মনে রাখতে হবে।”
বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জনে ছাত্রলীগের ‘অগ্রণী ভূমিকার’
কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “এই ঐতিহ্যের কথা মনে রেখে এই সংগঠনটাকে শক্তিশালী করে তোমরা
গড়ে তুলবে। সেটাই আমরা চাই।”
শেখ হাসিনা বলেন, “ছাত্রলীগ সংগঠনটা আমাদের দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক
কর্মকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা যদি আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলন,
ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, যে কোনো আন্দোলন যদি
আমরা দেখি সব থেকে বেশি রক্ত দিয়েছে, শহীদ হয়েছে আমাদের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া সংগঠন ছাত্রলীগ
নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ৭৩ বছর পূর্ণ করছে সোমবার।
আলোচনায় শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির
পিতার আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট জাতির পিতাকে
সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার কথাও বলেন তিনি।
জাতির পিতাকে হত্যার পর ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে
জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের চাওয়ার টানে দেশে ফেরার কথাও বলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।
ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে,
জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।
তিনি বলেন, “মনে রাখবে, যে আদর্শ নিয়ে গড়ে তুলতে
পারবে নিজেকে, সেই কিন্তু সফল হবে। আর যদি অর্থ সম্পদের দিকে নজর চলে যায়, কখনও সফল
হতে পারবে না।”
আগামী দিনে দেশকে নেতৃত্ব দিতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের
তৈরি হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “কারণ আমাদের আর কত…৭৫ বছর বয়স। আর কতদিন।
ছাত্রলীগের ৭৩, আমার ৭৫। কাজেই আমিও ৭৫ এ পা দিয়েছি। কাজেই আমরা কতদিন আর চলব।
করোনাভাইরাস সঙ্কটে নিরন্ন মানুষকে দিতে ত্রাণ প্রস্তুত করছে ছাত্রলীগের কর্মীরা (ফাইল ছবি)
“কিন্তু তোমাদেরকে কিন্তু সামনে নেতৃত্ব দিতে হবে।
সেইভাবে তোমরা নিজেদেরকে গড়ে তুলবে।”
করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি
মেনে চলার পরামর্শও দেন প্রধানমন্ত্রী।
মহামারী মোকাবেলার পাশাপাশি অর্থনীতি সচল রাখতে সরকারের নেওয়া
বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন তিনি।
মহামারীর এই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও স্কুলের শিক্ষার্থীদের
সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে পাঠদান এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে পাঠদানের নির্দেশনার
কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষার্থীদের প্রতি এই সময়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ
দিয়ে তিনি বলেন, “এটা একটা সুযোগ। পাঠ্যপুস্তক তো পড়বেই। তাছাড়াও আরও পড়ার অনেক সুযোগ
আছে। কারণ জ্ঞান যত বেশি অর্জন করতে পার, ততই নিজেকে আরও সম্পদশালী মনে করবে। ধন সম্পদ
কোনো দিন কোনো কাজে লাগে না।”
করোনাভাইরাস একটা শিক্ষা দিয়ে গেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী
বলেন, “যার যতই টাকা পয়সা থাকুক, যার যতই অর্থ, সম্পদ, বাড়ি, গাড়ি যা কিছুই থাকুক না
কেন সেগুলো যে একেবারেই ব্যর্থ- তার যে কোনো মূল্য থাকে না করোনাভাইরাস অন্তত এই শিক্ষাটা
মানুষকে ভালোভাবে দিয়েছে।
“কিন্তু শিক্ষা, বিদ্যা এটা এমন একটা শিক্ষা, এমন একটা সম্পদ
এই সম্পদ কিন্তু কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আর এই সম্পদটা থাকলে জীবনে কখনও হোঁচট খাবে
না। চলার পথ মসৃণ করে এগিয়ে যেতে পারবে। আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে আমরা সেই শিক্ষাই দিয়েছি।
“কাজেই তোমরাও সেভাবে শিক্ষা নেবে। ছাত্রলীগের সেটাই কাজ থাকবে।”
ছাত্রলীগের মূলমন্ত্র শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির কথা মাথায় রেখে
প্রতিটি নেতাকর্মীকে আদর্শ নিয়ে চলার আহ্বান জানান সরকার প্রধান।
ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে আলোচনা অনুষ্ঠানে
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির
নানক, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মোস্তফা জালাল
মহিউদ্দিন, ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়, সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্
বক্তব্য রাখেন।