ক্যাটাগরি

মাস্টারদার ফাঁসির দিনে বিপ্লবীদের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি

মঙ্গলবার
মাস্টারদার আবক্ষ মূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি আলোচনা সভা ও সমাবেশসহ বিভিন্ন
কর্মসূচিতে তার ৮৭তম প্রয়াণ দিবসে পালন করেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন।

শিক্ষা
উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এক বিবৃতিতে বলেন,
“চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলসহ যুব বিদ্রোহের অগ্রনায়ক ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেন। দেশের মানুষের প্রতি প্রবল ভালোবাসা ও চরিত্রের বলিষ্ঠতায়
তিনি তরুণদের আকৃষ্ট করেছিলেন।

“সূর্যসেন
গোপনে স্বাধীনতা সংগ্রামের জমি তৈরি করছিলেন। আজও বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে মাস্টারদাকে স্মরণ করে আমরা এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। বাঙালির বিপ্লবী প্রেরণায় তিনি ধ্রুবতারা।”

উপমন্ত্রী
পক্ষে নগরীর জে এম সেন
হল প্রাঙ্গণে সূর্যসেনের আবক্ষ ভাস্কর্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন নগর আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক জহর লাল হাজারী, সাবেক ছাত্রনেতা পুলক খাস্তগীর ও রুমকি সেনগুপ্ত।

চট্টগ্রাম
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন এক বার্তায় বলেন,
“প্রয়াণ দিবসে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মহান নেতার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।”

দিনটি
উপলক্ষে সকালে জে এম সেন
হল প্রাঙ্গণে বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে আলোচনা সভা হয়।

সেখানে
প্রধান বক্তা সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা বলেন, “মাস্টারদাকে সম্মান জানাতে হলে দালাল বেঈমান নেত্র সেন ও তাদের ভাবাদর্শিক
অনুসারীদের ঘৃণা করতে হবে।”

সভাপতির
বক্তব্যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতা তাপস হোড় বলেন, “রাষ্ট্রীয়ভাবে বিপ্লবীদের জন্য কোনো দিবস পালন করা হয় না। পাঠ্যসূচিতে
না থাকায় আমাদের সন্তানরা এই ইতিহাস থেকে
বঞ্চিত। সেজন্যই বিপ্লবী বাঘা যতীন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা যাত্রামোহন সেনের বাড়ি ভাঙচুর হয়।”

হিন্দু
ফাউন্ডেশনের সাবেক মহাসচিব শ্যামল পালিত বলেন, যাত্রামোহন সেনগুপ্ত, তার সন্তান যতীন্দ্র মোহনসেনগুপ্ত, নেলী সেনগুপ্তা উপমহাদেশ খ্যাত রাজনীতিবিদ। তাদের পারিবারিক জমিতে চট্টগ্রামে দশটির বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো টিকে আছে।

“তাদের
অবদান বাংলাদেশের জন্য যেমন গৌরবের, ঠিক তেমনি চট্টগ্রামের মানুষের জন্য আরো বেশি সম্মানের। সেই ঐতিহ্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে যাত্রামোহন সেনের বাড়িতে আঘাত করা জাতির জন্য খুবই লজ্জাজনক।”

অন্যদের
মধ্যে অধ্যক্ষ রীতা দত্ত, অধ্যাপক ড. বিপ্লব গাঙ্গুলী,
বীরকন্যা প্রীতিলতা ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি পঙ্কজ চক্রবর্তী, অধ্যাপক স্বদেশ চক্রবর্ত্তী, অ্যাডভোকেট শংকর প্রসাদ দে ও চন্দন
বিশ্বাস, বিপ্লবীপুত্র অনুপ রক্ষিত, বিপ্লবী পুত্র নন্দন কিশোর চৌধুরী, পরিষদের সভাপতি অঞ্জন কান্তি চৌধুরী, পরিষদের উপদেষ্টা দীপঙ্কর চৌধুরী কাজল, সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সিঞ্চন ভৌমিক ও অর্থসম্পাদক তপন
ভট্টাচার্য্য আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ।

মাস্টারদার
প্রয়াণ দিবসে বিপ্লবীদের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম বিপ্লব ও বিপ্লবী স্মৃতি
সংরক্ষণ পরিষদ।

পরিষদের
সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় নাট্যকর্মী প্রদীপ দেওয়ানজী বলেন, “যুব বিদ্রোহের ৯০ বছর পরও
স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং বিপ্লবীদের বাড়িঘর সংরক্ষণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় সেগুলো
বেশিরভাগই বেদখল হয়ে গেছে। বারবার আশ্বাস দিলেও সংশিষ্টরা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেনি।

“এই
দায়িত্বহীনতা ও অব্যস্থাপনার কারণে
প্রীতিলতার আত্মাহুতি স্মৃতি বিজড়িত তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাবটি এখনো জাদুঘর করা হয়নি। মাস্টারদা সূর্যসেনের নামে চট্টগ্রামে কোনো স্থাপনা নেই। এমনকি যাত্রামোহন সেনগুপ্ত ও দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন
সেনগুপ্তের বাড়িটি দখল ও ভাঙচুরের মত
ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটে গেছে। এখনই উদ্যোগ না নিলে এ
শহরে যুব বিদ্রোহের কোনো স্মৃতিচিহ্নই আর অবশিষ্ট থাকবে
না।”

‘মুক্তিযুদ্ধের
প্রজন্ম-বৃহত্তর চট্টগ্রাম’ আয়োজিত আলোচনা সভায় সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক
বেদারুল আলম চৌধুরী বলেন, “মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তারা স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে অবিচল ছিলেন। অন্যায়, নিষ্পেষণ আর ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে
রুখে দাঁড়াতে সূর্যসেনের আদর্শ এখনো আমাদের প্রেরণা।”

সংগঠনের
সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুন নাহার খুশীর সভাপতিত্বে প্রধান আলোচক ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী।

যুব
ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলার নেতৃবৃন্দও মাস্টারদার আবক্ষ মূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানায়।

জেলার
সভাপতি রিপায়ন বড়ুয়া বলেন, “যাত্রামোহন সেনগুপ্তের ঐতিহাসিক বাড়ি দখলের চেষ্টা এটি নিঃসন্দেহে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি ও প্রগতিশীল চেতনার
উপর আঘাত। অবিলম্বে ভবনটি অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করা হোক।”

জে
এম সেন হল প্রাঙ্গনে সূর্যসেনের
আবক্ষ মূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও লাল সালাম
জানিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বাসদ (মার্কসবাদী) চট্টগ্রাম জেলা শাখা।

এছাড়া
মাস্টারদা স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বীরকন্যা প্রীতিলতা ট্রাস্ট, চিটাগাং ট্রাস্ট, বাসদ সাংস্কৃতিক পরিষদ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বিভিন্ন সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

১৮৯৪
সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের
রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নে জন্ম হয় সূর্যসেনের। ১৯২১
সালে কিছু তরুণ চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। ‘ভারতীয় প্রজাতান্ত্রিক বাহিনী, চট্টগ্রাম শাখা’ গঠন করে সশস্ত্র এই বিপ্লবের নেতৃত্ব
দেন সূর্যসেন।

১৯২৩
সালের ডিসেম্বরে মাস্টারদার নির্দেশে ও অনন্ত সিংহের
নেতৃত্বে প্রকাশ্য দিবালোকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কোষাগার লুট করা হয়।

১৯৩০
সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা
সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ হয়। নগরীর দামপাড়া এলাকায় তৎকালীন পুলিশ ব্যারাকের অস্ত্রাগার দখল করে নেন বিপ্লবীরা। সেখানেই অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

এরপর
চার দিন ‘স্বাধীন’ ছিল চট্টগ্রাম। পরে ২২ এপ্রিল জালালাবাদ
পাহাড়ে ইংরেজ বাহিনীর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তিন ঘণ্টার সেই যুদ্ধে ৮২ জন ব্রিটিশ
সৈন্য নিহত হয় এবং ১২
জন বিপ্লবী শহীদ হন।

চট্টগ্রাম
অস্ত্রাগার লুন্ঠন, জালালাবাদ যুদ্ধ ও ইউরোপীয় ক্লাব
আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়া এ বিপ্লবীকে ১৯৩৩
সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক বিশ্বাসঘাতক গ্রামবাসীর
সহায়তায় গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশরা।

ওই
বছর অগাস্টে সূর্যসেনের ফাঁসির রায় হয়। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম
কেন্দ্রীয় কারাগারে মাস্টারদা সূর্যসেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে
ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ফাঁসির
আগে দুইজনকেই নির্যাতন করার বিবরণ ইতিহাসের বইয়ে লিপিবদ্ধ আছে। সূর্যসেনের মরদেহ বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের
মাঝামাঝি অংশে নিমজ্জিত করা হয় বলেও দাবি
করা হয়ে থাকে।