গত অগাস্ট থেকেই দেশের বাইরে ছিলেন সিরাজ। শুরুতে আইপিএল খেলেন সংযুক্ত
আরব আমিরাতে। সেখান থেকে সরাসরি দীর্ঘ অস্ট্রেলিয়া সফর। তার জীবনের মোড় ঘুরে গেছে এই
সময়টায়। অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজে অসাধারণ বোলিং করে বড় অবদান রাখেন ভারতের স্মরণীয়
সিরিজ জয়ে।
তবে প্রাপ্তিতে ভরা সফরের শুরুর দিকে হারানোর তীব্র ব্যথাও সইতে হয় তাকে।
গত ২০ নভেম্বর মারা যান তার বাবা মোহাম্মদ গাউস। সিরাজকে তখন দেশে ফেরার সুযোগ দিয়েছিল
ভারতীয় বোর্ড। কিন্তু দেশে গেলে হয়তো আর অস্ট্রেলিয়ায় ফেরা হতো না তার। কোয়ারেন্টিন
সংক্রান্ত জটিলতায় সফর হয়ে যেত অনিশ্চিত। বাবাকে শেষ দেখার তীব্র ইচ্ছে চাপা দিয়ে সিরাজ
অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যান বাবার স্বপ্ন পূরণের প্রতিজ্ঞায়।
সিরাজের বাবা অটো-রিকশা চালক মোহাম্মদ গাউস সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও অনেক
প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে ছেলেকে ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলেন। তার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে
দেশের হয়ে নিয়মিত খেলতে দেখবেন।
অস্ট্রেলিয়ায় বক্সিং ডে টেস্টে অভিষেক হয় সিরাজের। প্রথম টেস্টেই দুই ইনিংস
মিলিয়ে ৫ উইকেট নিয়ে তিনি সহায়তা করেন দলকে জেতাতে। এরপর ব্রিজবেন টেস্টে স্বাদ পান
প্রথমবার ইনিংসে ৫ উইকেট শিকারের। ভূমিকা রাখেন দলের সিরিজ জয়ে।
প্রায় ৬ মাস পর সিরাজ দেশে ফেরেন বৃহস্পতিবার। হায়দরাবাদে ফিরেই তিনি ছুটে
যান বাবার কবর জিয়ারত করতে। পরে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, বাবার শূন্যতা কতটা পোড়ায়
তাকে।
“ বাবার চলে যাওয়ার সময়টা খুব কঠিন ছিল। মুষড়ে পড়েছিলাম একদম। বাড়ির সবার
সঙ্গে কথা বলার পর তারাও তখন বলল বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে। শেষ সময়ে তার পাশে থাকতে
না পারা ছিল ভীষণ কষ্টের। তবে তার স্বপ্ন পূরণ করেই আমি ফিরেছি।”
যখন বাবা ছিলেন পাশে। ক্রিকেটের সাফল্যে সিরাজকে মিষ্টিমুখ করাচ্ছেন বাবা। ছবি : আইপিএল।
“ যতগুলি উইকেট আমি নিয়েছি, সবকটিই উৎসর্গ করেছি বাবাকে। যতবার আমি পারফর্ম
করি, তার অভাব অনুভব করি। কতবার যে মনে হয় বাবাকে ডাকি! পরমুহূর্তেই মনে পড়ে, তিনি
আর নেই। প্রচণ্ড মিস করি তাকে। আল্লাহ উনাকে জান্নাতে জায়গা দিন।”
শুধু বাবাকে হারানোর পরই নয়, মানসিক শক্তির প্রমাণ এই অস্ট্রেলিয়া সফরে
আরও দিয়েছেন সিরাজ। সিডনি টেস্টে যখন বর্ণবাদী আচরণের শিকার হন, প্রতিবাদ করে তিনি
প্রশংসা আদায় করে নেন অনেক। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে ভারত। ৬ জন দর্শককে
মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়।
সিরাজ বললেন, বর্ণবাদী কথা শুনেও ভেঙে পড়েননি তিনি।
“ অস্ট্রেলিয়ান দর্শকদের কিছু অংশের গালিগালাজ আমাকে মানসিকভাবে আরও শক্ত
করেছে। ওই ঘটনার প্রভাব আমার পারফরম্যান্সে পড়তে না দেওয়া ছিল গুরুত্বপূর্ণ।”
বর্ণবাদের ওই ঘটনার পর আম্পায়াররা ভারতকে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন
বলে জানালেন সিরাজ।
“ আম্পায়ারা বলেছিল, আমরা চাইলে মাঠ ছেড়ে যেতে পারি। তবে রাহানে ভাই (ভারপ্রাপ্ত
অধিনায়ক অজিঙ্কা রাহানে) বলেন, ‘আমরা মাঠ ছাড়ব না। আমরা কোনো ভুল করিনি। কাজেই আমরা
খেলবই।”
মূল পেসারদের কয়েকজনের চোট সিরাজকে এবার সুযোগ করে দেয় টেস্ট খেলার। সেই
সুযোগই কাজে লাগান তিনি। তবে এই সাফল্যে ভেসে যেতে চান না ২৬ বছর বয়সী পেসার।
“সিনিয়র বোলাররা চোট পাওয়ার পর পুরো দল আমার ওপর ভরসা করেছে। চ্যালেঞ্জিং
ছিল খুব, আমার ওপর চাপও ছিল অনেক। তবে এখন আমি ভারতের হয়ে খেলে যেতে চাই ও ভারতের হয়ে
পারফর্ম করতে চাই। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে আমাকে। সাফল্যকে মাথায় চড়ে বসতে দিতে
চাই না আমি।”
“ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ঠিক করতে হবে আমাকে। এই সিরিজের আত্মবিশ্বাস পরের সিরিজে
বয়ে নিতে চাই। টিম ম্যানেজমেন্ট যে ভূমিকা আমাকে দেবে, তা পালন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা
করব।”