ক্যাটাগরি

বিদ্রোহীদের রেখেই চট্টগ্রামে ভোটের লড়াইয়ে আ. লীগ

শুরু থেকে বিদ্রোহীদের
সরে যেতে নানা হুমকি-ধমকি, দল সমর্থিত প্রার্থীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত,
দল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ আর সবশেষ দুয়েকদিনের মধ্যেই ‘সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার হুঁশিয়ারিতেও
কাজ হয়নি।

ফলে বুধবার চট্টগ্রাম
সিটি করপোরেশনের এই নির্বাচনে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন
নিজ দলের অন্য প্রার্থীরা, যার প্রভাব মেয়রের ভোটেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা চট্টগ্রামের
রাজনৈতিক মহলে।

আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন
পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এখন আর বিদ্রোহীদের বিষয়ে মুখ খুলতে
নারাজ। তাদের দাবি, এর প্রভাব মেয়রের ভোটে পড়বে না।

শুরু থেকেই অভিযোগ
ছিল, চট্টগ্রামের কোনো কোনো নেতা নেপথ্যে থেকে বিদ্রোহীদের ইন্ধন দিচ্ছেন।

২০ জানুয়ারি চট্টগ্রামে
এসে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ বলেছিলেন, দুয়েক
দিনের মধ্যে কেন্দ্র থেকে বিদ্রোহীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার জানতে চাইলে
হানিফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা নির্বাচন পরিচালনার সাথে জড়িতরা ভালো
বলতে পারবে। তাদের সাথে কথা বলুন।”

দল থেকে চট্টগ্রাম
সিটি করপোরেশন নির্বাচন পরিচালনার প্রধান সমন্বয়ক আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার
মোশাররফ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দল প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ার পর
বিদ্রোহীদের তো দাঁড়ানোর কথা ছিল না। তারপরও তারা দাঁড়িয়েছে। কী করব, কিছু তো করার
নেই।

“আওয়ামী লীগ একটি বিশাল
আদর্শভিত্তিক দল। দলের সমর্থনের পর দাঁড়াবে না বলেও যারা দাঁড়িয়েছে তারা শৃঙ্খলা লংঘন
করেছে। হয়ত পরে কেন্দ্র থেকে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মেয়র পদে ভোটে এর কোনো
প্রভাব পড়বে না দাবি করে তিনি বলেন, “ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষেই রায় দেবেন। আওয়ামী লীগের
উন্নয়ন ও অর্জন অনেক। সে তুলনায় বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন করেনি।”

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের
৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে একটিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী
নির্বাচিত হয়েছেন। অন্য একটি প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় সেটিতে ভোটগ্রহণ হবে পরে। তাই
মোট ৩৯টি সাধারণ এবং ১৪টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ভোটগ্রহণ হবে বুধবার।

এরমধ্যে ৩২টি ওয়ার্ডেই
আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের বিপরীতে এক বা একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। গতবারের কাউন্সিলরদের
মধ্যে সাধারণ ও নারী আসনের ১৭ জন এবার দলের সমর্থন পাননি। তাদের মধ্যে যে ১২ জন নির্বাচন
করছেন তারা সবাই সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের
অনুসারী।

এবার কাউন্সিলর পদে
মনোনীতদের মধ্যে মাত্র ৮ জন নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

বিপরীতে তিনবারের সাবেক
মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে থাকা কয়েকবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং
দল ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পদের নেতারা এখন তার ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের
সাথে আছেন।

পুরনো এসব কাউন্সিলর
এবং নতুন মিলিয়ে ১৭ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী দলের সমর্থন পেয়েছেন, যারা চট্টগ্রামের
রাজনীতিতে এই ধারার অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

নগরীর কেন্দ্রে দলের
সমর্থন পাওয়া একটি ওয়ার্ডের একজন কাউন্সিলর প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এভাবে বিদ্রোহীদের রেখেই ভোটই যদি হবে তাহলে দলের
সমর্থন দেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল?

“এখন নিজেদের মধ্যে
বিরোধ হল। একই এলাকার প্রার্থী হওয়ায় কয়েকটি জায়গায় সংঘাত সংঘর্ষ হল। এতে কার লাভ হল?”

বিদ্রোহীদের মধ্যে
বেশিরভাগের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, হামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় মামলা, ভোটকেন্দ্র দখলসহ
নানা অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রামে নির্বাচনী
সহিংসতায় যে দুজন নিহত হয়েছেন, তাও আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের
বিরোধ থেকেই।

গত বছরের মার্চে প্রথম
যখন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়, সেই সময় ১৮ মার্চ রাতে ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী
ওয়ার্ডে সরাইপাড়া লোহারপুল এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থী মোরশেদ আকতার চৌধুরীর নির্বাচনী
কার্যালয়ে খুন হন আনোয়ার জাহের তানভীর (৪৫) নামের একজন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে দল
সমর্থিত প্রার্থী মো. ইসমাইলের দুই অনুসারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

করোনাভাইরাসের কারণে
নির্বাচন স্থগিতের সাড়ে নয় মাস পর ফের প্রচার শুরু হলে ১২ জানুয়ারি রাতে ২৮ নম্বর পাঠানটুলি
ওয়ার্ডে সংঘাতে নিহত হন আওয়ামী লীগকর্মী আজগর আলী বাবুল (৫৫)। বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল
কাদের ওরফে মাছ কাদেরের অনুসারীদের সঙ্গে দল সমর্থিত প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুরের
অনুসারীদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মহল্লা সর্দার আজগর। ওই মামলায় ডজনখানেক
অনুসারীকে নিয়ে এখন কারাবন্দি আব্দুল কাদের।

ওই ঘটনার পর ১৩ জানুয়ারি
রাতে নগর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে বিতর্কে জড়ান
সেখানকার শীর্ষস্থানীয় নেতারা। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় বিদ্রোহীদের তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়ে
ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে। সেই তালিকা কেন্দ্রে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগের
মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী ভোট ঘিরে আর যেন কোনো বিশৃঙ্খলা না হয় এবং নির্বাচনী
পরিবেশ যেন শান্তিপূর্ণ থাকে সে বিষয়ে দলের নেতাদের সহযোগিতা চান।