ক্যাটাগরি

মিয়ানমারে অভ্যুত্থান: জনমনে ক্ষোভ-উদ্বেগ

এ বিষয়ে এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিং অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতা দখলে কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ করলেও আপামর জনসাধারণের মনে উদ্বেগ, ক্ষোভ আর হতাশা বিরাজ করছে।

ইয়াংগুনের বাসিন্দা ৩২ বছরের জিজাওয়াহ রয়টার্সকে বলেন, ‘‘আমার খুব রাগ হচ্ছে। আমি আর সামরিক শাসন দেখতে চাই না।”

জিজাওয়াহ একটি কোম্পানির কমার্শিয়াল অপারেটর। রয়টার্সের কাছে নিজের ক্ষোভের কথা জানালেও পুরো পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি তিনি। তার আশঙ্কা, এতে তিনি প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘‘তারা যেটা করছেন সেটা স্বৈরতন্ত্র। আমরা সবাই জানি আমরা কাকে ভোট দিয়েছি।”

মূলত মিয়ানমারে গত ৮ নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের ফল ঘিরে দেশটির সরকারের সঙ্গে প্রভাবশালী সেনাবাহিনীর নতুন করে বিরোধের সূত্রপাত হয়।

সর্বশেষ নির্বাচনে বড় জয় পায় অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যেখানে ৩২২টি আসনে জয়ই যথেষ্ট সেখানে সু চির দল জয় পেয়েছে ৩৪৬টি আসনে।

সেনাবাহিনী সমর্থিত বিরোধীদল ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ভোটে প্রতারণার অভিযোগ তুলে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

তারা নতুন করে আবার নির্বাচন আয়োজনের দাবিও করে। নতুবা হুমকির সুরে সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতা দখলের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল। যে হুমকি আজ বাস্তব।

সোমবার মিয়ানমারের নতুন সরকারের পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী সোমবার ভোরেই রাজধানী নিপিধোতে অভিযান চালিয়ে অং সান সু চি এবং প্রেসিডেন্ট উয়িন মিন্টসহ এনএলডি-র শীর্ষ নেতাদের আটক করে।

মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী সু চি দেশটিতে দারুণ জনপ্রিয়। অর্ধ শতাব্দীর সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশকে গণতন্ত্রের পথে পরিচালিত করতে দীর্ঘ ১৫ বছর তিনি গৃহবন্দি জীবন কাটিয়েছেন।

সু চির হাত ধরেই ২০১৫ সালে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। যে কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে তিনি দারুণ সমাদৃত। যদিও তার দলের শাসনামলে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীর দমনপীড়নে সু চির ভূমিকা নিয়ে বিশ্ব জুড়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে।

অনেকে তখন বলেছেন, সু চি সেনাবাহিনীকে খুশি রেখে দেশ পরিচালনা করতে চাইছেন। এখন সেই সেনাবাহিনীই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার দলকে হটিয়ে ক্ষমতার দখলে চলে গেছে।

থেইনি ওও নামে একজন বলেন, ‘‘আইন অনুযায়ী আমাদের একটি নির্বাচন হয়েছে। জনগণ যাকে পছন্দ করে তাকে ভোট দিয়েছে। আমাদের এখন আইনগত আর কোনও সুরক্ষা রইল না। আমরা খুবই অনিরাপদ বোধ করছি, আতঙ্ক, উদ্বেগের মধ্যে আছি।”

সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর দেশজুড়ে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। টেলিভিশন ও রেডিওর সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ প্রায়।

মিয়ানমারের শহরগুলোতে এটিএম বুথের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। যদিও সেগুলোর বেশিরভাগই অচল হয়ে গেছে। দেশটির ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন আপাতত সব ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা করেছে। ভবিষ্যত অনিশ্চয়তায় লোকজন হুড়োহুড়ি করে নিত্যপণ্য কিনছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইয়ানকিন জেলার ১৯ বছরের এক তরুণী বলেন, ‘‘আমি সকাল থেকে দুইবার বাজারে গেছি। আমি চাল এবং অন্যান্য খাদ্য পণ্য কিনেছি। আমি জানি না কী ঘটছে। আমি একটু আত্ঙ্কিত হয়ে পড়েছি।”

ফেসবুকে এনএলডির ভেরিফাইড পেজ থেকে সেনাবাহিনীর হাতে আটক সু চির বরাত দিয়ে একটি বিবৃতি পোস্ট করা হয়েছে। যেখানে তিনি জনগণকে এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সড়কে বিক্ষোভে নামার আহ্বান জানান। পোস্টে বলা হয়, আটক হওয়ার আগে সু চি এই বিবৃতি লিখে যান।

অভ্যুত্থানের ফলে জনগণ উদ্বিগ্ন হলেও এর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের রাস্তায় বিক্ষোভে নামার কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। ছাত্র নেতা সি থু তুন বলেন, ‘‘আমাদের দেশ একটি পাখির মত ছিল, যে মাত্র উড়তে শিখছিল। এখন সেনাবাহিনী আমাদের ডানা ভেঙে দিয়েছে।”

তবে শুধু সেনা অভুত্থানের বিপক্ষে নয় কেউ কেউ পক্ষেও কথা বলছেন। একজন জাতীয় ভিক্ষু ফেইসবুকে এক ভিডিও পোস্টে বলেন, ‘‘আজ জনগণের খুশির দিন।