প্রতি বছর অমর একুশে
স্মরণে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও এবার মহামারীকালে সোমবার শহীদ মিনার
প্রাঙ্গণে সংক্ষিপ্ত পরিসরে ‘একুশের গান লড়াই অফুরান’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সংগঠনটি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে
শহীদ মিনারের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর জাতীয়
সঙ্গীত ও একুশের গান পরিবেশন করেন বহ্নিশিখা শিল্পগোষ্ঠীর শিল্পীরা। একুশের ঘোষণা পাঠ
করেন ড. শাহাদাৎ হোসেন নিপু।
এরপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা
সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বলেন, “একুশে ফেব্রুয়ারি আসলেই
বাংলা ভাষা সম্প্রসারণের জন্য আমরা নানা কথা বলি। কিন্তু সারা বছর সেই উদ্যোগ আর দেখা
যায় না। আমাদের জীবনে আমরা বাংলাকে যে কত অবহেলা করেছি, তার অনেক নজির আপনারা দেখতে
পাবেন। দেশে বাংলা ভাষার এমন অবস্থা যে, এখন বিয়ের কার্ডও ইংরেজিতে ছাপানো হয়।”
তিনি বলেন, “দেশের
আইনের ভাষা এমন কঠিন করে রাখা হয়েছে এবং বেশিরভাগ বিচারক বিচারের রায় দেন ইংরেজিতে,
যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য দুর্বোধ্য। আমরা চাই আইনের সকল ক্ষেত্রে সহজ সাবলীল বাংলা
ভাষা ব্যবহার, যাতে করে সবাই বুঝতে পারে।
“গণমাধ্যমে বিশেষ করে
কয়েকটি এফএম রেডিওতে বাংলা ভাষাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়। সেগুলো যদি বন্ধ না
হয় তাহলে সাধারণ মানুষ কোথা থেকে প্রমিত বাংলা শিখবে?”
নির্বাচন কমিশন ও দুদকের
সমালোচনা করে রামেন্দু মজুমদার বলেন, “নির্বাচন কমিশন, দুদক এগুলোকে দেখতে অনেকটা দন্তহীন
ব্যাঙ্গের মতো মনে হয়। আমরা তাদের কাছে আহ্বান জানাই, তাদের উপর যে দায়িত্ব রয়েছে
তারা যেন তা দলমত নির্বিশেষে পালন করেন। তাহলে দেশে সমাজ বিকশিত হবে। গণতান্ত্রিক সমাজ
আসবে। সেই সাথে একটি গঠনমূলক শক্তিশালী বিরোধী দল যেন থাকে এটা আমাদের সকলের কাম্য।”
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক
জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস বলেন, “আজ দেশের অফিস-আদালত থেকে শুরু করে আইন-আদালত, এমনকি
বিভিন্ন পোস্টার-প্ল্যাকার্ডে বাংলা ভাষার পরিবর্তে বিদেশি ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে।
অবস্থা এমন যে আজ বাংলা ভাষা নিজভূমে পরবাসীতে পরিণত হয়েছে।”
শুধু বৈদেশিক যোগাযোগ
ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ সব ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠানের
কর্মকাণ্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
গোলাম কুদ্দুস বলেন,
“সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু
আমাদের সুপ্রিম কোর্ট, যার দায়িত্ব হচ্ছে কোথায় সংবিধান ভঙ্গ হচ্ছে কি না তার দেখভাল
করা, কোথাও সংবিধান নিয়ে কোনো বিতর্ক হলে তারা ব্যাখ্যা প্রদান করা। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের
সাথে লক্ষ করেছি, আমাদের মহামান্য আদালত সংবিধান লংঘন করে বিদেশি ভাষায় রায় প্রদান
করে, বিচারকার্য পরিচালনা করে।”
বাংলা ভাষা সর্বস্তরে
ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা
দিবস। এর মূল তাৎপর্য হল, বাঙালি যেভাবে তাদের মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগ করেছে, তোমরাও
তোমাদের মাতৃভাষাকে লালন কর, পালন কর, সমুন্নত রাখ।
“অথচ আজকে বাংলা ভাষা
যেন নিজ ভূমিতে পরবাসী। বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে সরকারকে অবশ্যই পদক্ষেপ
নিতে হবে, এর অন্য কোনো বিকল্প নেই।”
অনুষ্ঠানে অন্যদের
মধ্যে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, সহ-সভাপতি ঝুমা চৌধুরী
উপস্থিত ছিলেন।