ক্যাটাগরি

অভিজিৎ হত্যা: জিয়াসহ ৫ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড, ফারাবীর যাবজ্জীবন

মঙ্গলবার
দপুরে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান সাড়া ফেলা এ মামলার রায়
ঘোষণা করেন।

২০১৫
সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে
স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে জঙ্গি কায়দায় হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী
অভিজিৎ রায়। চাপাতির আঘাতে আঙুল হারান তার স্ত্রী।

সেই
ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোড়ন সৃষ্টি করে।

একুশে বইমেলায় অভিজিৎ রায় ও রাফিদা আহমেদ বন্যা

একুশে বইমেলায় অভিজিৎ রায় ও রাফিদা আহমেদ বন্যা

পদার্থবিদ
অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ থাকতেন যুক্তরাষ্ট্রে। বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি মুক্তমনা ব্লগ সাইট পরিচালনা করতেন তিনি। জঙ্গিদের হুমকির মুখেও তিনি বইমেলায় অংশ নিতে দেশে এসেছিলেন।

রায়ে
বলা হয়, “আসামিরা সাংগঠনিকভাবে অভিন্ন অভিপ্রায়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশে বাধা
দেওয়ার উদ্দেশ্যে অভিজিৎ রায়কে হত্যা করে। সে কারণে তাদের
সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রাপ্য।”


মামলায় অভিযুক্ত ছয় আসামির মধ্যে
সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হক ওরফে জিয়া,
মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ওরফে শাহরিয়ার, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব, আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম ওরফে সাজ্জাদ ওরফে শামস), আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব ওরফে আবির ওরফে আদনান ওরফে আবদুল্লাহকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা
করে জরিমানা করা হয়েছে।

তারা
সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য বলে তদন্তকারীদের ভাষ্য।

আর
অপর আসামি উগ্রপন্থি ব্লগার শফিউর রহমান ফারাবীকে রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত না থাকলেও ফেইসবুকে
পোস্ট দিয়ে অভিজিৎ রায়কে ‘হত্যার প্ররোচনা দিয়েছিলেন’ বলে তাকে এ মামলায় আসামি
করা হয়।

আসামিদের
মধ্যে জিয়া ও আকরামকে পলাতক
দেখিয়েই এ মামলার বিচার
কার্যক্রম চলে। বাকি চার আসামি রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার রায় ঘোষণার আগে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার আদালতে আনা হয় আসামিদের। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার রায় ঘোষণার আগে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার আদালতে আনা হয় আসামিদের। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

আইনজীবীরা
জানান, ফারাবীকে রায়ের পর কিছুটা বিমর্ষ
দেখালেও বাতি তিনজন রায়ের আগে ও পরে ছিল
একই রকম ‘উৎফুল্ল ও উদ্ধত’।
তাদের একজন দুই আঙুল তুলে ‘ভি’ চিহ্নও দেখান। 

দণ্ডিত
আসামিদের মধ্যে জিয়া, সায়মন ওরফে শাহরিয়ার, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব, আকরাম হোসেন ওরফে হাসিবকে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার রায়েও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অভিজিৎ
হত্যা মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খায়রুল ইসলাম লিটন ও মো. নজরুল
ইসলাম বলেছেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে
তারা আপিল করবেন।

অন্যদিকে
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি গোলাম সারোয়ার খান জাকির বলেছেন, এই রায়ে তারা
সন্তুষ্ট।

রায়ের
সময় অভিজিতের পরিবারের কেউ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। অভিজিতের স্ত্রী বন্যা আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। আর অভিজিতের বাবা
এ মামলার বাদী অধ্যাপক অজয় রায় বিচারের শেষ দেখে যেতে পারেননি।

ছেলের
মৃত্যুর ঘটনায় মন ভেঙে গিয়েছিল
তার, সেই শোক সইতে না পেরে স্ত্রীও
গত হয়েছিলেন বছরখানেক আগে। এ মামলার বিচার
চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রয়াত
হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক অজয় রায়।

অভিজিতের
ছোট ভাই অনুজিত রায় বলেছেন, রায়ের সময় উপস্থিত থাকতে চাইলেও অসুস্থতার কারণে তা পারেননি।

রায়ের
পর টেলিফোনে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি এ রায়ে সন্তুষ্ট।
তবে রায় দ্রুত কার্যকর করা হোক। জিয়াসহ যারা পলাতক, যারা হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হোক। যদি গ্রেপ্তার করা না যায়, তাহলে
আবার নতুন ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়।”

অভিজিৎ হত্যার রায় ১৬ ফেব্রুয়ারি
 

অভিজিৎ হত্যা: আসামিদের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে যুক্তিতর্ক শেষ রাষ্ট্রপক্ষের
 

অভিজিৎ হত্যায় জিয়া-ফারাবীসহ ৬ জনের বিচার শুরুর আদেশ

জিয়ার নির্দেশেই বইমেলায় অভিজিতকে হত্যা: অভিযোগপত্র

প্রেক্ষাপট

যুদ্ধাপরাধীদের
সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের উত্তাল আন্দোলনের মধ্যে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার পর
ধারাবাহিকভাবে জঙ্গি হামলার শিকার হতে থাকেন লেখক, ব্লগার, প্রকাশক, সমকামী অধিকারকর্মীরা।

মুক্তমনা
ব্লগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত রায় নিয়মিত বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন। উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অবস্থানের কারণে
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এই প্রকৌশলীকে হত্যার
হুমকি দিয়ে আসছিল জঙ্গিবাদীরা।

২০১৫
সালের একুশের বইমেলায় দুটি বই প্রকাশ হয়
অভিজিতের, সে কারণেই স্ত্রী
বন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ওই বছর ১৫
ফেব্রুয়ারি তিনি দেশে আসেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে
বইমেলায় এক অনুষ্ঠান শেষে
ফেরার পথে হামলার শিকার হন তারা।

সিসি ক্যামেরায় অভিজিৎ রায় ও বন্যা আহমেদকে অনুসরণকারী এই যুবকই কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত শরীফুল বলে পুলিশের দাবি

ঘটনার
পর শাহবাগ থানায় এই হত্যা মামলা
দায়ের করেন অধ্যাপক অজয় রায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হাত ঘুরে মামলাটির তদন্তভার কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের হাতে যায়।

হত্যাকাণ্ডের
চার বছর পর ২০১৯ সালের
১৩ মার্চ ছয়জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম। অভিযোগের পক্ষে ৩৪ জনকে সাক্ষী
করা হয়।

ঢাকার
সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইবুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান ওই বছর ১
অগাস্ট অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার ছয়
আসামির বিচার শুরুর আদেশ দেন।

অভিযোগপত্রে
নাম থাকা রাষ্ট্রপক্ষের ৩৪ জন সাক্ষীর
মধ্যে ২৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণের
পর কারাগারে থাকা চার আসামি গত ২৭ জানুয়ারি
আদালত নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।


ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি গোলাম ছারোয়ার খান জাকির আসামিদের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে যুক্তিতর্ক শেষ করেন। পরদিন আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে।

বইমেলার বাইরে হামলায় লেখক অভিজিৎ নিহত

সিসি ক্যামেরায় অভিজিতের ‘খুনি’

অভিজিৎ হত্যায় সন্দেহভাজনদের নতুন ভিডিও

যা
ছিল অভিযোগপত্রে

বাংলাদেশকে
নাড়িয়ে দেওয়া ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত
শেষে ২০১৯ সালে জমা দেওয়া সিটিটিসির অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে ১২ জনের সম্পৃক্ততার
তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের মধ্যে পাঁচজনের পূর্ণfঙ্গ নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি। একজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়ায় অভিযোগপত্রে আসামি করা হয় মোট ছয়জনকে।
আসামিরা জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য।

নিষিদ্ধ
জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের (আগের
নাম আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) নেতা জিয়ার ‘নির্দেশেই’ সেদিন অভিজিতের ওপর হামলা হয় বলে উল্লেখ
করা হয় অভিযোগপত্রে।

২০১২
সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনী
এক সংবাদ সম্মেলনে সরকার উৎখাতে ধর্মান্ধ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নস্যাৎ করার খবর দেয়। অভ্যুত্থানচেষ্টাকারীদের নেতা হিসেবে জানানো হয় মেজর জিয়ার
নাম।

তখন
সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া জিয়া পালিয়ে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামে যুক্ত
হন বলে পুলিশের ভাষ্য।

আসামিদের
মধ্যে মারা যাওয়ার কারণে মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনজন। মান্না ইয়াহিয়া ওরফে মান্নান রাহি ও আবুল বাশার
চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান।

হত্যাকাণ্ডে
সরাসরি অংশ নেওয়া দলটির নেতৃত্বে থাকা মুকুল রানা ওরফে শরিফুল ২০১৬ সালের ১৯ জুন ঢাকার
খিলগাঁওয়ে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

উগ্রপন্থি
ব্লগার সরাসরি ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত
না থাকলেও ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে অভিজিৎ রায়কে ‘হত্যার প্ররোচনা দিয়েছিলেন’ বলে তাকেও এ মামলায় আসামি
করা হয়।