তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনীকে নিয়ে নানা ধরনের ‘অপপ্রচার’ চালানো হচ্ছে, যাতে একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। সেনাবাহিনী এসব অপচেষ্টাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে।
গত ১ ফেব্রুয়ারি ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে আল-জাজিরার ওই প্রতিবেদন প্রচারিত হওয়ার পর আইএসপিআরের মাধ্যমে দুই দফা বিবৃতি দিয়ে তার প্রতিবাদ জানিয়েছে সেনা সদর।
যখন ওই প্রতিবেদন আল-জাজিরা প্রচার করে, জেনারেল আজিজ আহমেদ তখন সরকারি সফরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন।
১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরার পর মঙ্গলবার সকালে তেজগাঁওয়ে আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের অনুষ্ঠান শেষে তিনি প্রথমবারের মত এ বিষয়ে কয়েকটি টেলিভিশনের সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন।
চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, সময় টেলিভিশনসহ কয়েকটি টিভি ইতোমধ্যে সেনাপ্রধানের ওই বক্তব্য সম্প্রচার করেছে।
সেখানে আল-জাজিরা প্রসঙ্গে প্রশ্নের উত্তরে জেনারেল আজিজ বলেন, আইএসপিআরের মাধ্যমে যে রিজয়েন্ডার দেওয়া হয়েছে, সেটা সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল বক্তব্য।
“ইতোমধ্যে আমি নিশ্চিত, আপনারাও জানেন যে, যে ধরনের অপচেষ্টাগুলো হচ্ছে, এগুলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মত একটা প্রতিষ্ঠান, যেটা জাতির গর্ব, দেশের গর্ব, এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে তারা নানান ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। যাতে করে একটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন মিথ্যা: সেনাসদর
“আপনাদেরকে আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই। সেনাবাহিনী অত্যন্ত প্রশিক্ষিত এবং ওয়েল মোটিভিটেড একটা ফোর্স, আগের থেকে অনেক বেশি সুসংহত, সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড অত্যন্ত ইফেকটিভ। এবং সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য ঘৃণাভরে এ ধরনের অপচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছে অতীতে, এখনো করছে এবং বর্তমানে যা আছে, তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছে। এবং আমাদের চেইন অব কমান্ডে যারা আছে, এ ব্যাপারে তারা সবাই আমরা সতর্ক আছি।”
সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, “আমি আশ্বাস দিতে চাই আপনাদেরকে, সেনাবাহিনীতে, এই ধরনের অপপ্রচার বিন্দুমাত্র আঁচ আনতে পারবে না তারা আমাদের চেইন অব কমান্ডে। সেনাবাহিনী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বাংলাদেশের সংবিধানকে সমুন্নত রাখার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ, বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুগত এবং বাংলাদেশ সরকারের, বর্তমান সরকারের যে কোনো আদেশ-নির্দেশ পালনে সদা প্রস্তুত এবং বাংলাদেশের সেটা অভ্যন্তরীণ হোক বহির্বিশ্বের হোক, যে কোনো সমস্যার মোকাবিলার জন্য আমরা সাংবিধানিকভাবে শপথবদ্ধ। তো এটা নিয়ে আমার মনে হয় যে দুশ্চিন্তা করার তেমন কিছু নাই।”
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে সেনাপ্রধানের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যেসব প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে যেভাবে সেনাপ্রধানের চলাফেরার ভিডিও করা হয়েছে, সে বিষয়ে সাংবাদিকরা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদন ‘অপপ্রচার’: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
উত্তরে জেনারেল আজিজ বলেন, “প্রথম কথা হল, আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যে কথাটা বলা হয়েছে, আমি আপনাকে প্রশ্ন করি, আপনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সাজা আছে, কিন্তু, আপনি যদি গতকাল সে সাজা থেকে অব্যাহতি পেয়ে থাকেন, আপনার বিরুদ্ধে যদি আর কোনো মামলা রানিং না থাকে, আপনাকে কি ফিউজিটিভ বলা যাবে আজকে? আপনাকে কি বলা যাবে যে, আপনি সাজাপ্রাপ্ত?
“কারণ, যখন আপনি অব্যাহতি পেয়ে যান কোনো একটা চার্জ থেকে, তার পরের দিন থেকে আপনি যে কোনো মুক্ত একজন নাগরিকের মতো। আমার ভাইদের সম্পর্কে যে অপপ্রচারগুলো এসেছে, সেটার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। খুব শিগগিরই আমার পরিবারের পক্ষ থেকেও সংবাদ সম্মেলন করে আপনাদেরকে সব জানানো হবে।”
সেনাপ্রধান বলেন, “এতটুকু আমি আপনাদেরকে বলতে পারি, আমি সেনাপ্রধান হিসেবে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি, আমার অবস্থান, আমার দায়িত্ব সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। কী করলে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে, কী করলে সেনাবাহিনীতে আমার যে দায়িত্ববোধ, আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়াটা হয়েছে, সেটা খর্ব হতে পারে, আমি সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।
“আমার ভাইয়ের সঙ্গে যখন মালয়েশিয়াতে দেখা করেছি, তখন তার নামে কোনো মামলা ছিল না। যে একটা ষড়যন্ত্রমূলক মামলা ছিল, সেটা থেকে অলরেডি অব্যাহতিপ্রাপ্ত ছিল। সেই অব্যাহতি মার্চ মাসে হয়েছিল। আমি এপ্রিল মাসে গিয়েছিলাম। এখানে আল-জাজিরা যে স্টেটমেন্টটা দিয়েছে, সেটা সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে দিয়েছে। কারণ সেদিন আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে, আমি যদি বলি, সেদিন না কোনো সাজা ছিল, না তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল। তার আগেই যে মামলাটা ছিল, সেটা থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।”
জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, “সেকেন্ড যে জিনিসটা হল যে, বিভিন্ন সময়, আপনি যেটা বললেন যে, বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সময় আমার যে চিত্র ধারণ করা হয়েছে, আমি সেনাপ্রধান হিসেবে মনে করি, যখন আমি অফিসিয়াল ক্যাপাসিটিতে কোথাও থাকব, তখন আমার নিরাপত্তা সেটা হলো অফিসিয়ালি নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। আমি যেখানেই যাই, সেটা হোস্ট কান্ট্রি করে থাকে। সেখানে আমার অতিরিক্ত কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।
আল জাজিরার প্রতিবেদনের প্রতিবাদ সেনা সদরের
“কিন্তু, যখন আমি কোথাও আমার ব্যক্তিগত সফরে থাকি, হয়তো আসার সময় ট্রানজিটে কোনো আত্মীয়-স্বজনের কাছে যাই, সেই সময় অফিসিয়াল কোনো প্রোটোকল আমার ব্যবহার করা, আমি সেটা কখনো সমীচীন মনে করি না। আমি মনে করি সেটা অপচয় এবং সেটা আমার উচিত নয়। সেক্ষেত্রে সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি কিছু করে থাকে, তাদের অসৎ উদ্দেশ্য, সেটা আপনারা তো এখন ভালো করেই জানেন এবং আমাদের রিজয়েন্ডার পাওয়ার পরে আপনারা বুঝতে পারছেন, যারা এ কাজগুলো করেছে, কেন করেছে, তাদের উদ্দেশ্যটা কী হতে পারে।”
সেনাপ্রধান বলেন, “আপনারা প্রশ্ন করেছেন, বারবার কেন আমাকে টার্গেট করা হয়। আমার মনে হয় সেটার দায়িত্ব আমি আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম। আপনারাই বুঝে নেন, খুঁজে নেন, কেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধানকে টার্গেট করা হচ্ছে।
“কারণ, এই সেনাপ্রধানকে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। সেনাপ্রধানকে হেয় প্রতিপন্ন করা মানে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হেয় প্রতিপন্ন করা। আপনাদেরকে এই জিনিসটা বুঝতে হবে।”
জেনারেল আজিজ বলেন, “আমি সম্পূর্ণভাবে সচেতন যে, আমার কারণে যদি কখনো আমার ইনস্টিটিউশন, অরগানাইজেশন যেটা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং আমাদের সরকার যাতে কোনোভাবে বিব্রত না হয়, বিতর্কিত না হয়, আমি সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন। যা কিছু আপনারা শুনছেন, এগুলোর কোনো প্রমাণ, এগুলো হয়তো বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা কাট-পিস অন্যান্য জিনিস সন্নিবেশিত করে তারা এগুলো করতেই পারে। বাট, তাদের এই উদ্দেশ্য হাসিল হবে না। এবং সেটা আপনারা আপনাদের কলমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে তাদেরকে জবাব দিয়েছেন এবং সেজন্য আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।”
আল জাজিরার প্রতিবেদনের সঙ্গে বাংলাদেশের যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না- এমন প্রশ্নও একজন সাংবাদিক করেন।
উত্তরে সেনাপ্রধান বলেন, “কিছু কিছু ব্যাপার আছে যেটা হয়তো যে, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তেমন কিছু করার হয়ত থাকবে না তাদের বিরুদ্ধে। আমি নিশ্চিত, সেটা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যারা আছে বা সংস্থা যারা আছে, তারা হয়তো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।”
ছবি: আইএসপিআর
ফ্লাইং ব্রেভেট প্রদান
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার আগে আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের ফ্লাইং ব্রেভেট প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।
অনুষ্ঠানে তিনি নবীন সেনা বৈমানিকদের ফ্লাইং ব্রেভেট পরিয়ে দেন বলে আইএসপিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপিতে জানানো হয়।
এভিয়েশন বেসিক কোর্স শেষ করে ব্রেভেট পাওয়া এই অফিসাররা এখন সেনা বৈমানিক হিসেবে নতুন দায়িত্ব পালনের জন্য তৈরি হলেন।
আইএসপিআর জানিয়েছে, ২০১৯ সালের ২৫ অগাস্ট থেকে মোট বিশজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা ১১তম এভিয়েশন বেসিক কোর্সে অংশ নেন। সেখানে তাদের বিমান চালনার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য বিভিন্ন বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।