মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে মঙ্গলযজ্ঞ, আরতি আর ভক্তদের পুষ্পাঞ্জলিতে সিক্ত হলেন শ্বেত পদ্মে আসীনা বীণাপাণি।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানালোকের প্রতীক। বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী তিনি, যার হাতে আছে বীণা আর বই।
মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সাদা রাজহাঁসে চেপে দেবী ধরায় আসেন। মর্ত্যলোকে ভক্তরা অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে কল্যাণময়ী দেবীর চরণে পূজার অর্ঘ্য নিবেদন করেন।
সারা দেশে বিভিন্ন মন্দিরের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঐতিহ্যগতভাবে সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হয় প্রতিবছর। মহামারীর কারণে এবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পূজার আনুষ্ঠানিকতায় সেই আড়ম্বর ছিল না। স্বল্প পরিসরে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে পূজার আয়োজন করা হয়।
সরস্বতীর পূজাকে কেন্দ্র করে অন্যবছর যে রকম মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আলোচনা সভা কিংবা জনসমাগম হয়, ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে এবার তাতে নিষেধ ছিল।
তারপরও বসন্তের বর্ণিল সাজে সেজে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ পূজা মণ্ডপে এসেছেন। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়।
বকশীবাজারের সোমা কর্মকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে তার চার বছরের মেয়ে প্রাপ্তি পালীকে হাতেখড়ি দিয়েছেন। দেবীর কাছে প্রার্থনা করেছেন, তার মেয়ে যেন বিদ্যায় বুদ্ধিতে আলোকিত মানুষ হতে পারে।
সোমা বলেন, “আমার মেয়ে সকাল থেকে উপোস করে আছে, আজকে তার হাতেখড়ি হবে। এই দিনটির জন্য আমরাও অপক্ষায় ছিলাম।”
সরস্বতীর পূজার দিন পুরোহিত মস্ত্র পাঠ করিয়ে শিশুদের হাতে কাশ ফুলের কলম ও রূপক দোয়াত তুলে দেন। ওই কলম দিয়ে একটি মাটির সরায় (পাত্র) লেখার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক লেখা-পড়া শুরু করে শিশু। একেই বলা হয় ‘হাতেখড়ি’।
ইসলামবাগ আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে শান্তা মণ্ডল শ্রাবণী। ঢাকেশ্বরী পূজামণ্ডপে এসে বিদ্যার দেবীর চরণ ছুঁয়ে ভালো ফলাফলের প্রার্থনা করেছে সে।
শ্রাবণী বলে, “করোনার কারণে স্কুলে যেতে পারিনি। ঠিকমত আমাদের পড়াশোনাও হয় নাই। তাই আজকের এই দিনে মায়ের আশীর্বাদ আমাদের খুবই দরকার। মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছি, এসএসসি পরীক্ষায় যাতে একটা ভালো রেজাল্ট করতে পারি।”
ঢাকেশ্বরী পূজামণ্ডপে এসেছিল আজিম ওয়েস্টার্ন হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র প্রীতম হালদার।
সেও বললো, “অনেকদিন ধরে স্কুলে যেতে পারছি না। বন্ধুদের সাথে দেখা হচ্ছে না। প্রার্থনা করেছি, তিনি যেন দ্রুত আমাদের স্কুলে ফেরার ব্যবস্থা করে দিন। আমাদের সবাইকে যাতে বিদ্যা-বুদ্ধি দেন।”
এবার বিসিএস পরীক্ষা দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনুরাধা বিশ্বাস। সরস্বতীর পায়ে বেশ কয়েকটি কলম ছুঁইয়ে প্রার্থনা করতে দেখা যায় তাকে।
প্রশ্ন করতেই বললেন, “আমি বিসিএস ক্যাডার হতে চাই। মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছি, তিনি যেন আমার স্বপ্ন পূরণ করে দেন।”
ছেলে-মেয়েকে নিয়ে লালবাগ থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এসেছিলেন শ্যামসুন্দর বণিক। তিনি বললেন, একবছর ছেলেমেয়রা স্কুলে যেতে পারেনি। তাদের পড়ালেখায় অনেক ক্ষতি হয়েছে।
“মা যেন করোনা দূর করে দেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাতে দ্রুত খুলে যায়। বাচ্চারা যাতে আবার সুন্দরভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরতে পারে। আমাদের ছেলে মেয়েরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক। দেশ সুন্দর-সমৃদ্ধ করতে পারে, সেটাই মায়ের কাছে চাওয়া।”
যাত্রাবাড়ী থেকে প্রতি বছর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এসে সরস্বতীর প্রতি ভক্তি জানান রিতা সাহা। তিনি বললেন, “মহামারীর মধ্যে প্রার্থনা, মা যেন আমাদের সবাইকে সুস্থ রাখেন, ভালো রাখেন। আমাদের সবাইকে যাতে বিদ্যা-বুদ্ধি দেন।”
প্রতি বছর ঢাকায় সবচেয়ে বড় পরিসরে সরস্বতী পূজার আয়োজন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জগন্নাথ হলে। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় আয়োজন ছিল সীমিত পরিসরে।
আগের রাতে মণ্ডপে দেবীর প্রতিমা স্থাপন থেকে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সকালে দেবীকে দুধ, মধু, দই, ঘি, কর্পূর ও চন্দন দিয়ে স্নান করানো হয়।
সকাল ৯টার দিকে শুরু বাণী অর্চনা। পুরোহিত ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমল লোচনে/বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যংদেহী নমোহস্তুতে’ মন্ত্রপাঠ করে দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। এরপর ভক্তরা দেবীকে পুষ্পাঞ্জলি দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার মানুষ সেখানে সরস্বতীর আরাধনা করেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছিলেন সাবেক শিক্ষার্থীরাও।
তাদের একজন নিলয় কুমার বিশ্বাস বলেন, “অন্য বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক বিভাগের উদ্যোগে আলাদাভাবে পূজা মণ্ডপ তৈরি করা হত থিম ধরে। এ বছর মহামারীর জন্য সেটি করা সম্ভব হয়নি। পূজার যে আনন্দ সেটি নেই বললেই চলে। আগে আমরা মণ্ডপে এলে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হত, অনেক আনন্দ করতাম। কিন্তু এ বছর তাদের দেখা পেলাম না। তারপরও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছি, কিছুটা হলেও ভালো লাগছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান দুপুরে জগন্নাথ হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহাসহ হলের আবাসিক শিক্ষক ও অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন সে সময়।
সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে উপাচার্য বলেন, “হিন্দু শাস্ত্রমতে বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী আশীর্বাদ প্রদানের জন্য প্রতিবছর এই দিনে আবির্ভূত হন। দেবীর এই সর্বজনীন আশীর্বাদ সকলকে উদার ও মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তুলুক, সেই প্রত্যাশা।”
জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রত্যেক বছর জগন্নাথ হলে মহাসমারোহে উৎসবমুখর পরিবেশে সরস্বতী পূজা উদযাপন হয়। বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট পূজামণ্ডপ তৈরি করে সরস্বতীর কাছে প্রার্থনা করে। এ বছর তো আর ওভাবে আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না।
“কেন্দ্রীয়ভাবে একটি পূজামণ্ডপে ধর্মীয় রীতি, আচার-অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্তভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য কষ্টদায়ক, শিক্ষার্থীরা হলে নেই, এ অবস্থায় পূজা করতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন,“আমরা আশা করছি দেবী সরস্বতী আমাদের করোনামুক্ত করবেন, শিক্ষার পরিবেশ ফিরেয়ে দেবেন, আমরা যাতে আগামী বছর আগের মত করে সেই উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা পালন করতে পারি, সেই প্রার্থনা করছি।”