আতিক বললেন, “দেখি ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া মারে। সকালেও দেখি ড্রেনে কী যেন ওষুধ ছিটায়। কিন্তু মশা তো কমে না।”
রাজধানীতে বেড়ে গেছে কিউলেক্স মশার ঘনত্ব। এই মশা কামড়ালে ডেঙ্গুর মত রোগ হওয়ার ভয় নেই। কিন্তু মশার জ্বালায় নগরবাসী অতিষ্ঠ।
কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এবার মশা বেড়েছে। মশার উপদ্রব কমাতে অঞ্চলভিত্তিক ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ নেওয়ার চিন্তা করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পাল্টাচ্ছে মশার ওষুধ।
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা নূর উল্লাহ সোহেল জানালেন, গত বছর মার্চ এবং পরের দুই তিন মাস তার এলাকায় মশার উৎপাত তেমন ছিল না। সে সময় মশা নিয়ন্ত্রণে থাকলে এ বছর কেন তা হচ্ছে না- সেই প্রশ্ন করেন তিনি।
“এটা তো হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট না। সরকারের সদিচ্ছার অভাব আছে। মানুষের মধ্যে রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে মতবিরোধ আছে, কিন্তু মশার অত্যাচারের ব্যাপারে তো কারো কোনো দ্বিমত নেই।”
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, তার নয় তলার বাসার দরজা জানালা সব সময় বন্ধ থাকে বলে মশা ঢুকতে পারে না। অফিসেও মশা ঢোকার সুযোগ রাখেননি। কিন্তু কয়েক দিন আগে কল্যাণপুরে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ঢাকায় মশার যন্ত্রণা কতটা- তা টের পেয়েছেন তিনি।
কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হওয়ায় ডোবানালা, খালের বদ্ধ পানিতে কিউলেক্স মশার বংশ বিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
“সন্ধ্যার পর সেখানকার অবস্থাটা এমন, আমি যদি বাতাসে হাত দিয়ে মশা ধরতে চাই, তাহলে হাত ভর্তি মশা পাব। অন্যান্য বছরের চেয়ে মশা এবার বেশি মনে হচ্ছে। ছোট ছোট মশা, বেশি বড় না। আমি যতক্ষণ ছিলাম, টের পেয়েছি।”
মশার ঘনত্ব নিয়ে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে কাজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। রাজধানীতে মশার উপদ্রব যে গত বছরের এই সময়ের চেয়ে অনেক বেশি, তার জরিপেও তা উঠে এসেছে।
কবিরুল বাশার জানান, প্রতি মাসে ঢাকার ছয়টি এলাকাকে নমুনা ধরে সেখানে জরিপ করেন তারা। সেজন্য শনির আখড়া, শাঁখারীবাজার, মোহাম্মদপুর-শ্যামলী, পরীবাগ-সেন্ট্রাল রোড-শাহবাগ, উত্তরা এবং খিলগাঁও-বাসাবো এলাকার বিভিন্ন স্থানে মশার ঘনত্ব মাপার যন্ত্র (ডিপার) বসানো হয়।
প্রতিটি এলাকায় ২০০টি করে ডিপার বসানো হয়। ডিপার একবার পানিতে ডুবিয়ে তুলে আনার পর তাতে কতগুলো মশার লার্ভা পাওয়া গেল তা গণনা করা হয়। সবগুলো নমুনা সংগ্রহের পর গড় করে ওই এলাকায় মশার ঘনত্ব বের করা হয়।
গবেষণার ফলাফল জানিয়ে কবিরুল বাশার সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ বছর মশার ঘনত্ব গত বছরের চেয়ে বেশি পেয়েছেন তিনি।
“সব জায়গায় সমান পাওয়া যায় না। গত বছর প্রতিটি ডিপারে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০টি লার্ভা পেতাম। কিন্তু এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে পাওয়া গেছে গড়ে ৫০ থেকে ৫৫টি। ক্র্যাশ প্রোগ্রাম না নিলে, ঝড় বৃষ্টি না হলে মার্চে এই মশা আরও বাড়তে পারে।”
গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। ডোবানালা, খালেও পানি বেশি ছিল। ঢাকার এসব বদ্ধ জলাশয়ে পানি জমে থাকায় মশার বংশ বিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে জানান কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, “জমে থাকা পানিতে ব্রিডিং সাইট তৈরি হয়েছে। যত বেশি ব্রিডিং সাইট হবে, কিউলেক্স মশার বংশবৃদ্ধি তত বেশি হবে। এবার এটাই হয়েছে।”
বড় ধরনের ঝড়-বৃষ্টি হলে প্রাকৃতিকভাবে কিউলেক্স মশা কমে যাবে। তবে সেই আশায় না থেকে দ্রুত মশক নিধন কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন ড. মঞ্জুর।
“বৃষ্টি কবে হবে সেই আশায় বসে থাকলে চলবে না। ডিএনসিসি এরিয়া ওয়াইজ প্রোগ্রামে যাবে বলে শুনেছি। এটা করলে ভিজিবল একটা ফলাফল আসবে বলে আশা করছি।”
A city corporation worker spraying mosquito repellents in the Dhaka University’s TSC area on Oct 18, 2020. Photo: Asif Mahmud Ove
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মশা সমস্যার সমাধানে কার্যকর উপায় খুঁজছেন তারা। সোমবারও দিনভর বৈঠক করেছেন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।
“আমি কীটতত্ত্ববিদদের কাছে জানতে চেয়েছি মশা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী। তারা বলেছেন, বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় এবার মশার উপদ্রব বেশি।”
আগামী ৮ বা ১০ মার্চ থেকে ডিএনসিসি এলাকায় অঞ্চলভিত্তিক ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হবে জানিয়ে আতিকুল ইসলাম বলেন, “আগে ওয়ার্ডভিত্তিক ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করতাম। এখন এটা অঞ্চলভিত্তিক করব। দশটা অঞ্চল থেকে সব কর্মী, যন্ত্রপাতি নিয়ে একযোগে কাজ করব। আমরা দেখতে চাচ্ছি কেমন কাজে আসছে। পাশাপাশি একটা বৃষ্টি দরকার।”
অবশ্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরীর দাবি, এ বছর মশা ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি’।
তিনি বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএসসিসি উৎস নির্মূলসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। মশা মারার কীটনাশকও পরিবর্তন করা হচ্ছে।
“ফগিংয়ের জন্য মেলাথিয়ন ব্যবহার করা হত। ওইটা দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে হয়ত রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়েছে। এ কারণে আমরা বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করেছি। আমরা নতুন করে ডেল্টামেথ্রিন ব্যবহার করতে যাচ্ছি।
“ডেল্টামেথ্রিনের সঙ্গে ডিজেল কী পরিমাণ মেশাব সে বিষয়ে আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসেছি। তারা আমাদের একটা ফর্মুলা দিয়েছেন। ফর্মুলা অনুযায়ী আমাদের আমদানি করা ওষুধ যদি ব্যবহার করি, আশা করছি মশা আরও নিয়ন্ত্রণে আসবে।”