‘মাহা সাংগ্রেং পোয়ে’ নামে রাখাইনদের সর্ববৃহৎ
এই সামাজিক উৎসবকে ঘিরেই এখন মাতোয়ারা রাখাইন পল্লিগুলো। বইছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস।
শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা নাচে-গানে মেতে উঠেছে।
আয়োজকরা জানান, শনিবার ছিল রাখাইন বর্ষ ১৩৮৩
সালের শেষ দিন। আর রোববার শুরু হয়েছে নতুন ১৩৮৪ রাখাইন বর্ষ। জলকেলি বা মাহা সাংগ্রেং
পোয়ে ধর্মীয় কোনো আচার নয়, এটি সামাজিক রীতি। উৎসব চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত।
তবে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে বুধবার
অর্থাৎ বাংলা বর্ষের চৈত্র সংক্রান্তির দিন থেকে। ওইদিন থেকে রাখাইনরা বৌদ্ধ বিহারগুলোতে
পালন শুরু করেন নানা ধর্মীয় আচার। কক্সবাজারের প্রতিটি রাখাইনপল্লিতে আয়োজন করা হয়েছে
উৎসবের। জেলায় অন্তত অর্ধশত প্যান্ডেলে এ উৎসব হচ্ছে।
রাখাইন বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন
কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মংছেন হ্লা রাখাইন বলেন, উৎসব উপলক্ষে রোববার সকালে প্রতিটি
রাখাইনপল্লি থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা শোভাযাত্রা নিয়ে বৌদ্ধ বিহারে যান। এতে অল্প-বয়সীরা
মাটির কলস এবং বয়স্করা কল্পতরু বহন করেন। এরপর সেখানে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের পর্ব
শেষ করেন। বিকালে তরুণ-তরুণীরা বাদ্যযন্ত্র সহকারে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ায় জলকেলি উৎসবের
প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে।
নানা ফুল আর রং-বেরংয়ের কাগজে সাজানো হয়
প্যান্ডেল। মাঝখানে থাকে পানি রাখার ড্রাম। একপাশে তরুণী আর অন্যপাশে থাকে তরুণের দল।
তারা নাচে-গানে মেতে উঠে একে অপরের প্রতি ছুড়তে থাকে মঙ্গলজল। রাখাইনদের বিশ্বাস, এই
মঙ্গলজল ছিটানোর মধ্য দিয়ে মুছে যায় পুরাতন বছরের ব্যথা, বেদনা, গ্লানি, অপ্রাপ্তির
হতাশা আর অসঙ্গতি। এতে নতুন বছরকে শুচিতার মাধ্যমে বরণ করা হয়ে থাকে সকলের মঙ্গল কামনায়।
আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ
সম্পাদক মংথেন হ্লা রাখাইন বলেন, রাখাইন বর্ষবিদায় ও বরণকে ঘিরে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে
নানা আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে রাখাইন পল্লিগুলো। এতে প্রধান আকর্ষণ জলকেলি বা মাহা
সাংগ্রেং পোয়ে। আর রাখাইন তরুণ-তরুণীরা সারাবছর মুখিয়ে থাকে এই উৎসবের জন্য। রাখাইন
সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব তাদের জাতিসত্তার অন্যতম পরিচায়ক।
কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক
মং এ খেন রাখাইন বলেন, রাখাইন সম্প্রদায়ের জলকেলি বা সাংগ্রেং পোয়ে উপলক্ষে সংস্কৃতি
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শহরের আছিমং পেশকার পাড়ায় করা হয়েছে কেন্দ্রীয় উৎসবের প্যান্ডেল।
জেলা সদর, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী, পেকুয়া
ও চকরিয়া উপজেলার রাখাইন পল্লিগুলোতে এই উৎসব উদযাপিত হচ্ছে। এতে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক
কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে।
বিকালে কক্সবাজার শহরের আছিমং পেশকার পাড়ায়
স্থাপিত প্যান্ডেলে জলকেলি উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক
(শিক্ষা ও আইসিটি) বিভীষণ কান্তি দাশ।
বিভীষণ কান্তি দাশ বলেন, বাংলাদেশ সব ধর্ম-বর্ণ
জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। এ দেশের আবহমান সংস্কৃতি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা। জলকেলি
উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেটা প্রমাণিত হয়েছে। রাখাইনদের পাশাপাশি স্থানীয়রাও এই উৎসবে
অংশ নিচ্ছে।
রাখাইনদের সর্ববৃহৎ এই উৎসব নির্বিঘ্নে পালনে
প্রশাসন সব ধরনের নিরাপত্তা নিয়েছে বলে জানান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।
রাখাইন বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের
সভাপতি মং ছেন হ্লা রাখাইনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার
পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ
সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মং উখেন রাখাইন, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক
ডা. মাঁয়েনু রাখাইন, আদিবাসী ফোরাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মংথেন হ্লা রাখাইন।
আরও পড়ুন: