ক্যাটাগরি

প্রতীকী ভাস্কর্য বানিয়ে ভাস্কর্যবিরোধিতার প্রতিবাদ শিল্পীদের

শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন করেন তারা। শিল্পীদের এই কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।

কর্মসূচিতে মানব বলয়ে প্রতীকী ভাস্কর্য তৈরিসহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবয়ব ও তর্জনীর ভাস্কর্য নির্মাণ করেন শিল্পীরা। পাশাপাশি ‘মৌলবাদী অপশক্তির’ ব্যাঙ্গাত্মক চিত্র অঙ্কন করে শৈল্পিক প্রতিবাদ জানান চারুশিল্পীরা।

ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শনিবার প্রতীকী ভাস্কর্য নির্মাণ, চিত্রাঙ্কন ও প্রতিবাদী কথা আয়োজন করেন বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শনিবার প্রতীকী ভাস্কর্য নির্মাণ, চিত্রাঙ্কন ও প্রতিবাদী কথা আয়োজন করেন বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

এ সময় ‘স্বাধীনতা বিরোধী ও ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক প্রতিবাদী কথা অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন বলেন, “ভারত বিভক্ত হওয়ার আগে থেকেই আমরা এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে দেখছি, একদল কট্টর মৌলবাদী মধ্যযুগীয় চিন্তা ধারণ করে আছে এবং আমাদের সকল অগ্রযাত্রায় প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করছে। আবার এটাও দেখছি এসব বাধা অতিক্রম করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কিছু কাজ আমরা দ্বায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে করেছি। তার একটি হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে মানব রপ্তানি করে তাদের তাঁবেদার বানানো। তারা সেখানে গিয়ে দেশ নিয়ে নানা অপতৎপরতা চালায়। এই ধরনের চিন্তা-ভাবনা বা এগুলোর লালনক্ষেত্র অন্ধকারাচ্ছন্ন মাদ্রাসাগুলোকে আমরা আলোকিত করেনি। আমরা তাদের কোনো রকম বোঝাপড়ার মধ্য না গিয়ে তাদের চাহিদা মতো কাজ করছি। এখন সময় এসেছে, এসব মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।” 

এই শিল্পী বলেন, “মসজিদের খুতবায় এদেশের সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অনেক কথা বলা হয়। সেখানে অনেক সরকার দলের লোক থাকেন। কিন্তু তারা কোনো প্রতিবাদ করেন না। ফলে সেখানে উপস্থিত মানুষ এই কথা সত্য মনে করেন এবং এর দ্বারা প্রভাবিত হন। সেখানে কোনো প্রতিবাদ না করে শুধু রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলে মৌলবাদীদের প্রতিহত করা যাবে না। তাদেরকে সেখানেই প্রতিহত করতে হবে।”

মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, “যে ভাস্কর্য তারা ভেঙেছে, তার প্রতীকী ভাস্কর্য এখানে নির্মাণ করা হয়েছে। এটা একটা শৈল্পিক প্রতিবাদ। সংস্কৃতির ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তুলে আমরা তাদের রুখে দেব।”

তিনি বলেন, “ভাস্কর্য শুধু শিল্প নয়, এটি ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধারণ করে। তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা, কুষ্টিয়ায় ভাস্কর্য ভাঙার মাধ্যমের আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে, বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধাচরণ করছে। যে সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে আমাদের জাতীয়তাবাদ তৈরি হয়েছে, তারা সেই জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে মহাজাগরণ তৈরি হয়েছিল, তার মূল ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, সকল মানুষের সমঅধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্র।

“কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শক্তির বংশধররা আজকে ধর্মের নামে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নামে তারা পুরো জাতিকে বিভাজিত করার চেষ্টা করছে। চরমোনাই পীরের সন্তান ধোলাইপাড়ে ভাস্কর্য নিয়ে যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছে, তার পিতা নিজেই বলেছেন, তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। মামুনুল হকের পরিবারের বিষয়ে তো আমরা সবাই জানি।” 

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে তারা সংবিধান লংঘন করেছে অভিযোগ করে নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, “তারা কুষ্টিয়ায় জাতির পিতার ভাস্কর্য ভেঙেছে, বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভেঙেছে। এ ধরনের ভয়াবহ কর্মকাণ্ড করেও তারা গর্বের সাথে জীবনযাপন করছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এটি আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়, জাতির জন্য লজ্জার বিষয়। আমরা মনে করি, এদের শাস্তি দিতে হবে। সংঘাতের মধ্য দিয়ে শাস্তি নয়, সংবিধান লঙ্ঘনের অপরাধে তাদের শাস্তি দিতে হবে। সংবিধান লংঘন করলে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে, এটিই আমাদের দাবি।”

আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল বলেন, “আজকে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, ধর্মব্যবসায়ী জামাত-শিবির রাজাকারদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অপশক্তি আবার নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙেছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে সারা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করেছে।

“ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তস্নাত যে বাংলাদেশ, যে দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও আদিবাসী উপজাতিদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই দেশে ধর্ম নিয়ে কোনো রাজনীতি করেতে দেওয়া হবে না। যে কোনো মূল্যে বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে আমরা ঊর্ধ্বে তুলে ধরব। আর সেই জন্যেই আজকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পূর্ণ সংহতি নিয়ে এই বিক্ষুব্ধ শিল্পীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি।”

মানবাধিকার কর্মী আল আযম খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিশ্বাস মতিউর রহমান বাদশা, আওয়ামী যুব লীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া শামীম, জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পদক রোকুজ্জামান রোকন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সদস্য ডা. মামুন আল মাহতাব, গৌরব ৭১ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এফএম শাহীন, চিত্রশিল্পী বীরেণ সোম ও মনিরুজ্জামান।