তারা বলছেন, সংক্রমণ এবং মানুষের মৃত্যু যে হারে বাড়ছে, তা সামলাতেই লকডাউন জরুরি ছিল।
তবে লকডাউনের সুফল পেতে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ জারি করে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত এবং নন-কোভিড হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তারা।
এছাড়াও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন-জীবিকা নিশ্চিতে সামাজিক সহায়তা দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে কয়েকজন আবার এক সপ্তাহের এই নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিপক্ষেও মত দিয়েছেন। মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে নানা পেশার মানুষের কাছ থেকেও।

ফাইল ছবি
গত বছরের ৩০ নভেম্বর থেকে দৈনিক শনাক্ত রোগী কমতে শুরু করে, পাশাপাশি কমে সংক্রমণের হারও। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২৯১ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়।
পরে আবার বাড়তে শুরু করে সংক্রমণ। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মাত্রা অনেক বাড়তে থাকে।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশে গত এক দিনে আরও ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরও ৫ হাজার ৬৮৩ জন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ধীরে ধীরে কঠোর হতে শুরু করে সরকার। প্রথমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ১৮দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। এরপর পর্যটন এলাকাগুলোতে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারির পাশাপাশি বিদেশিদের বাংলাদেশে প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।
অবশেষে শনিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ ওবায়দুল কাদের জানানা, সরকার আপাতত আগামী সোমবার থেকে এক সপ্তাহের ‘লকডাউন’ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাম হোসেনও লকডাউন কেমন হতে পারে তার কিছুটা আভাসও দেন।
তবে ‘লকডাউন’ শব্দতে আপত্তি জানিয়েছেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন।তিনি মনে করেন, এটি সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য একটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক ব্যবস্থা।
“এটি একটি জনস্বাস্থ্যের সর্বশেষ ব্যবস্থা। দেশব্যাপী যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করে দেওয়ার একটা সুযোগ করে দেওয়া। এখন রেস্টুরেন্টে ভিড় হচ্ছে, দোকানে ভিড় হচ্ছে, ঘরের মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ঢালাওভাবে সব বন্ধ করে ওইগুলোর নিয়ন্ত্রণে এটা করা হয়েছে।”
এটি কোনো স্থায়ী ব্যবস্থাও নয় উল্লেখ করে কেমব্রিজের পিএইচডি ডিগ্রিধারী এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “আমাদের যে হারে সুনামির গতিতে রোগী বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে, সেটাকে সাময়িকভাবে সামাল দেওয়ার জন্যই এ ব্যবস্থা। তবে এটাই একমাত্র বা স্থায়ী ব্যবস্থা না। লকডাউন হয়ত না দিতে পারলেই ভাল হত। কিন্তু বাধ্য হয়েই দিচ্ছে সরকার, এছাড়া উপায় নেই।”

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় মাস্কের চাহিদা ও দাম বেড়েছে। সরকারের লকডাউনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার এক ঘণ্টার মধ্যে বাবুবাজারে দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচের পাইকারি বাজারে মাস্কের দামও বেড়েছে দ্বিগুণ। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি
সরকারের প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করা গেলে লকডাউন কার্যকর হবে বলে মনে করেন মুশতাক হোসেন।
“প্রান্তিক মানুষদের খুবই সমস্যা হবে। সেক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সরকার ও প্রতিবেশীদের সহায়তা দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা ডা. বে-নজির আহমেদের মতে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছাড়ানো বন্ধ করতে লকডাউন জরুরি ছিল।
“যাতে করে বেশি আক্রান্ত এলাকা থেকে কম আক্রান্ত এলাকাগুলোতে সংক্রমণ না ছড়ায়, সেটা নিশ্চিত করতেই লকডাউন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা যেটা পরামর্শ দিচ্ছিলাম যে, শুধুমাত্র লকডাউন না, বরং লকডাউনের সাথে সংক্রমণ কমানোর জন্য যে ব্যবস্থাগুলো, সেগুলোও পাশাপাশি রাখা দরকার।
“সেজন্য একটা জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করা গেলে একদিকে চলাচল যেমন বন্ধ হত, পাশাপাশি আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিনটা ভালোভাবে করার দরকার ছিল। হাসপাতালে রোগীর জায়গা না থাকলে অন্য হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভর্তির ব্যবস্থা করা। আমরা লকডাউনের সাথে অন্য কাজগুলো না করলে হয়ত সংক্রমণ কমবে, কিন্তু কেউ কেউ হয়ত চিকিৎসা সেবাটা সেভাবে পাবেন না।”
জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সংক্রমণ ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরেও এ কার্যক্রম চালানো গেলে কয়েক মাসের মধ্যেই ‘অনেকটাই’ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করা যেত বলে মনে করেন তিনি।
“এখন সাতদিন লকডাউন দিয়েছে, এরপরে হয়ত আরও সাতদিন বাড়ানো হবে। কিন্তু সেখান থেকে সবচেয়ে বেশি ফল পেতে আইসোলেশন, ট্রেসিং, কোয়ারেন্টিন করতে হবে।”
তবে এক সপ্তাহের লকডাউন একটি অবৈজ্ঞানিক ধারণা বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী। হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের এই পরিচালক বলেন, “কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এটা দেওয়া হল, আমরা জানি না। আমরা সব সময়ই মনে করি, চূড়ান্ত কর্মসূচি গ্রহণের আগে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হয়। কিন্তু আমরা সেটি দেখছি না।”
তিনি বলেন, “ধাপে ধাপে আগানো হলে সমস্ত সভা সমাবেশ স্থগিত করা হত, কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে সমস্ত বিপণিবিতান ৬ ঘণ্টার জন্য খোলা থাকত, সমস্ত অফিস অর্ধেক জনবল নিয়ে চালানোর কথা বলা হত, যেসব অফিস ভার্চুয়ালি করা যেত, তা করা হত।

করোনাভাইরাস সংক্রমণে লাগাম দিতে গণপরিবহনে নেওয়া হচ্ছে অর্ধেক যাত্রী। স্বাস্থ্যবিধি মানা, ভাড়া আদায় তদারকিতে শনিবার ঢাকার রমনা ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটের সামনে বসেছে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি
“জনসমাগম এবং মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে পথে নামিয়ে দেওয়া হত, পাড়া-মহল্লায় তদারক কমিটি হত এগুলো দেখার জন্য। এগুলো করার পর যদি ব্যর্থ হত, তখন লকডাউন দিলে চলত। এভাবে হুট করে লকডাউন দিয়ে মানুষকে বিপদে ফেলাটা যথাযথ নয়।”
তবে সরকারের লকডাউনের সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা ফাতেমা-তুজ-জোহরা মনে করছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যে হারে বাড়তে শুরু করেছে, সেক্ষেত্রে লকডাউন ছাড়া আর এটা নিয়ন্ত্রণের কোনো পাথ ছিল না।
“প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে আক্রান্ত বাড়ছে, এক্ষেত্রে অফিস-আদালত, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যদি খোলা থাকত, তাহলে মানুষ কর্মক্ষেত্রে যেত, গণপরিবহনে উঠত। এতে সংক্রমণ আরও অনেক বেড়ে যেত। লকডাউন হওয়ার কারণে এগুলো বন্ধ হবে। তবে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি কতটুকু মানবে, লকডাউন কতটুকু মানবে, সেটা আসলে তাদের ব্যাপার।”
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে লকডাউনের সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও এতে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বেসরকারি চাকুরে রাশেখ উর রহমান।
“একে তো সামনে রোজা। তার উপরে আবার সোমবার থেকেই লকডাউন। নিঃসন্দেহে এটার প্রভাব পড়বে বাজারে। আমাদের হয়ত হোম অফিস করতে হবে, বাইরে বের হতে হবে এজন্য লকডাউন হওয়ায় ভালই হবে।
“আবার আমরা একটু খেয়াল করলে দেখব, নিম্নবিত্ত মানুষ যারা আছেন, তাদের জন্য এ সময়টায় চলা খুব কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারের পক্ষেও কিন্তু সবার জন্য খাদ্যের যোগান দেওয়া সম্ভব না। তবে, খেটে খাওয়া দিনমজুর, বাসের হেলপার, রিকশাওয়ালা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারের সহায়তা দেওয়া উচিত।”
পূরবী সুপার মার্কেটের জুতার ব্যবসায়ী নাসির বলেন, “দেশের যে পরিস্থিতি লকডাউন না দিয়ে সরকার করবে কি? সচেতনতা তৈরি করাটা বেশি জরুরি। সরকার তো সবকিছু সামাল দিতে পারবে না।”

ঢাকার রমনা ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটের সামনে শনিবার বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। করোনাভাইরাস সংক্রমণে লাগাম দিতে গণপরিবহনে নেওয়া হচ্ছে অর্ধেক যাত্রী নেওয়াসহ স্বাস্থ্যবিধি মানছে কিনা তা দেখতে। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি
করোনাভাইরাস মহামারীতে গতবছর ব্যবসায় অনেক লোকসান হয়েছে জানিয়ে এই ব্যবসায়ী বলেন, “ব্যবসার সাথে জড়িত থাকায় আমরা লকডাউনের পক্ষেও যেতে পারি না, বিরোধিতাও করতে পারি না। গত বছর ব্যবসা মাইর গেছে, এবারও যদি এমন হয় তাহলে তো দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে।”
সরকারকে সামাজিক সহায়তা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
লকডাউনে কাজ না পেলে কীভাবে চলবেন তা ভেবে দিশেহারা রাজমিস্ত্রী গোলাম হোসেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা যারা দিন আনি দিন খাই, তারা কেমনে চলুম বলেন? জমানো টাকা ভাইঙ্গা কয়দিন চলা যায়। একটা ব্যবস্থা কইরা সরকারের লকডাউন দেওয়া উচিত ছিল। পেটে ভাত না থাকলে লকডাউন কি মানা যাইব?”