সেখানে সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় কোনোমতে তাদের সংসার চললেও করোনাভাইরাস মহামারীতে শিশু শিক্ষার্থীদের বন্ধ থাকা লেখাপড়ার কথা ভাবতে পারছিলেন না কেউ।
এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের কথা ভেবে এগিয়ে আসেন ওই গ্রামের আবিয়ার সরদারের কিশোরী মেয়ে মাদ্রাসা ছাত্রী মনিরা খাতুন।
গত ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্পানে তার পরিবারও বসত-ভিটা হারিয়েছে।
বাঁধে আশ্রয় নেওয়া পরিবারের শিশুদের নিজেদের খুপরি ঘরের সামান্য ফাঁকা জায়গায় সকাল-বিকাল লেখাপড়া করাচ্ছেন তিনি। বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে হাত খরচের অর্থে এই শিশু শিক্ষার্থীদের কিছু খাবারেরও ব্যবস্থা করেন মনিরা।
বাঁধে আশ্রয় নেওয়া তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমান, আবির ও আকলিমা জানায়, তাদের বাবা-মা নদীতে মাছ ধরেন। আম্পানের পর বেড়িবাঁধের ওপরই আশ্রয় হয়েছে তাদের। করোনায় তাদের লেখাপড়া বন্ধ ছিল। এই অবস্থায় মনিরাকে পেয়ে খুব আনন্দিত।
গৃহবধূ মমতাজ, পারভীন ও কোহিনুর জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ঘরবাড়ি হারিয়ে এই গ্রামের প্রায় একশ পরিবার গত ছয় মাস ধরে আশ্রয় নিয়েছে বেড়িবাঁধের ওপর। সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় কোনোমতে তাদের সংসার চললেও করোনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া শিশু শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার কথা ভাবতে পারছিলেন না কেউ।
মনিরা নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাশ্রমে তাদের সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছে বলে সন্তানদের পাশাপাশি তারাও খুব খুশি।
কাঠমারচর গ্রামের তৈয়বুর রহমান বলেন, স্থানীয় আবিয়ার সরদারের তিন মেয়ের মধ্যে মনিরা সবার ছোট। মনিরার বড় দুই বোনও কলেজে অধ্যয়নরত। গ্রামের মানুষ এই পরিবারটিকে শিক্ষানুরাগী হিসেবেই জানে।
“আমরা যতটুকু পারছি মনিরার এই কাজে সহযোগিতা করছি যাতে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালু থাকে।”
মনিরা জানান, করোনাভাইরাসের কারণে প্রায় নয় মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এর মধ্যে আম্পানের তাণ্ডবে ঘরবাড়ি হারিয়ে দিশেহারা অবস্থা মানুষের। সবাই ঘর সংসারের চিন্তায় ব্যস্ত। ইচ্ছা থাকলেও কেউ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার কথা ভাবতে পারছিল না। নিয়মিত লেখাপড়া না করলে শিশুরা সব ভুলে যাবে। তাছাড়া এই অবস্থায় অনেক শিশুর ঝরে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এমন চিন্তায় নিজ উদ্যোগে তাদের লেখাপড়া চালু রাখার ব্যবস্থা করেছেন বলে তিনি জানান।
মনিরা জানান, স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে এবার দাখিল পরীক্ষার্থী তিনি। তার নিজের লেখাপড়ার পাশাপাশি গ্রামের অসহায় পরিবারের শিশুদের শিক্ষা চালিয়ে নিতে তার এই প্রচেষ্টা।
মনিরা খাতুনের মাদ্রাসার সুপার আবদুস সাত্তার বলেন, “সে মেধাবী ছাত্রী। এবারের দাখিল পরীক্ষায় মনিরা ভালো ফল করবে বলে আশা করি। তার নিজের লেখাপড়ার পাশাপাশি অন্যদের লেখাপড়া চালু রাখায় তার শিক্ষক হিসেবে আমি গর্ববোধ করছি।”
উত্তর বেদকাশি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলাম বলেন, ওই গ্রামের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস বাগদা চিংড়ি। কেউ নদীতে জাল টেনে, কেউ ছোট চিংড়ি ঘেরে কাজ করে আবার কেউ চিংড়ির পোনা বিক্রি করে সংসার চালায়।
“এখানকার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে কিশোরী মনিরা যে উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। আমরা তাকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করব।”
কয়রা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, “দুর্যোগকালীন শিক্ষা চালু রাখতে কিশোরী মনিরা যেভাবে এগিয়ে এসেছে তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। সাধ্যানুসারে তাকে সহযোগিতার চেষ্টা করব।”