ক্যাটাগরি

স্মরণে শাহনাজ রহমতুল্লাহ

শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠে ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়ে’ ও ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে‌ এবার বল’- গান তিনটি বিবিসি’র একটি জরিপে সর্বকালের সেরা বিশটি বাংলা গানের তালিকায় স্থান পায়।

১৯৯২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯০ সালে ‘ছুটির ফাঁদে’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করা দেশাত্মবোধক ও বিরহের আধুনিক গানের সত্তর আশির দশকের জনপ্রিয় এই শিল্পীর ২ জানুয়ারি জন্মদিন। তাকে স্মরণ করে লিখেছেন আরাফাত শান্ত।

প্রিয় শাহনাজ রহমতুল্লাহ, আশাকরি ওপারে ভালোই আছেন। আপনি যা দিয়ে গেছেন তার তুলনা চলে না।

হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের খ্যাতিমান শিল্পী। অথচ এই প্রজন্মের অনেকেই শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র নাম অব্ধি শুনেনি। চলে যাওয়ার পর অনেকে তার কথা বলছে, শুনে ভালো লাগে।

অনেককাল আগে কলকাতার শিল্পী রূপঙ্করের এক সাক্ষাৎকার দেখছিলাম, সেখানে তিনি বলছিলেন, শৈশবে শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র গান শোনার আনন্দ।

পাকিস্তানে এই শিল্পীর জনপ্রিয়তা নিয়ে তো কোনো প্রশ্নই চলে না। সব ছেড়ে ছুড়ে তিনি এই মুল্লুকের শিল্পী হয়েছেন। তার চলে যাওয়ার খবর, জন্মদিনের খবর ওদের প্রাইমটাইম নিউজে গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশে শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র মতো কন্ঠ সাবিনা ইয়াসমীন ছাড়া আর কারও সঙ্গেই তুলনা চলে না।

এই শিল্পী কিছু অজনপ্রিয় গানের কথা বলি, যেমন- ‘তুমি কি সেই তুমি নেই’। এরকম গান আগামী ৫০ বছরেও হবে না। কিংবা সহজ গান বলি একটা, ‘বন্ধুরে তোর মন পাইলাম না’। এরকম ‘ফোক মেলোডি’ খুব কম আধুনিক গানেই আছে।

আর জনপ্রিয় গান অবশ্যই দেশের গান। তার গান এতই বেশি জনপ্রিয় যে এদেশে একটা বড় রাজনৈতিক দল সেই গানকে তাদের দলীয় গান বানিয়ে ছেড়েছে।

যদিও আলাউদ্দিন আলী বলেছিল, “দলীয় সংগীত হিসাবে গানটা এত পপুলার হবে তা আমি ভাবি নাই।”

সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়ার চলে যাওয়ার পর শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র গান বেজেছে টিভিতে অন্তহীন। তার ভাই স্বনামধন্য সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ, নায়ক জাফর ইকবাল এদের ভেতরেও এই শিল্পী উজ্জ্বল নিজের প্রতিভায়।

কুমার বিশ্বজিৎ বলেছিলেন, “শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র বাসায় ঢাকার বুকে সত্তর আশির দশকে এক শান্তির নীড়, সারাদিন আড্ডা গানবাজনা আর খাওয়া-দাওয়া।”

তার প্রস্থানের পর একটা ছবি দেখেছিলাম। অনেক আগের। শাহনাজ রহমতুল্লাহ গান গাইছেন, জাফর ইকবাল তবলা বাজাচ্ছেন- খুবই মন খারাপ হল।

কোন গান ছেড়ে কোন গানের কথা বলবো। ‘একবার যেতে দে না’ কিংবা ‘আমারও দেশেরও মাটির গন্ধে’ অথবা ‘আমায় যদি প্রশ্ন করে’ – এরকম গান আজ পর্যন্ত তিনি ছাড়া আর কেইবা গেয়েছে।

‘ছুটির ফাঁদে’ সিনেমায় শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র যে গান সাগরের সৈকতে, এরকম বিষণ্ণ গান আর কখনও শুনিনি কোথাও।

অনেকদিন আগে পাঞ্জাবি সেলাই করতে দিয়েছি, টেইলর গুনগুন করে গাচ্ছেন, ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’।

অনেকদিন শান্তি লাগতো এই ভেবে যে, আমি যে শহরে থাকি সেই শহরে অন্য প্রান্তে সাবিনা ইয়াসমীন শাহনাজ রহমাতুল্লাহর মত শিল্পীরা থাকতো। মনটা খারাপ হয়ে যায়, আপনি আর এ শহরে নেই।

সেদিন আমার এক বন্ধু, ইংল্যান্ড থেকে বলছিলো, “কি ভেবে যে তোরা এত দেশ দেশ করিস বুঝি না।”

আমি অবশ্য এদের মতো না। আমার এখনও দেশ ভালো লাগে। ভালো লাগার অন্যতম আসল কারণ আমার দেশ সুন্দর নয়, মানুষরাও উত্তম কিছু না, এতদিন এ দেশ আমাকে টিকিয়ে রেখেছে তাই। আর এ টিকে থাকার পেছনে পরিবার ও বন্ধু কিংবা প্রেমিকার পর যার সব থেকে বেশি অবদান তা হল শাহনাজ রহমাতুল্লাহর গান। গত এক যুগ ধরে আমি শুনেই চলছি।

‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’ কিংবা ‘আমায় যদি প্রশ্ন করে’- এসব শুনে শুনে আমার এই দুর্বিনীত দেশটাকেও ভালো লাগে। অথবা আপনি একাত্তর নিয়ে ভাববেন, আপনার চোখ ছলছল করে উঠবে— ‘এক নদী রক্ত পেরিয় ‘ বা ‘সোনামুখি সুই দিয়ে সেলাই করা কাজ’ শুনলে।

বিস্তৃত ধানক্ষেত দেখে গেয়েই উঠলাম কত গুনগুন করে, ‘আমারও দেশেরও মাটির গন্ধে’ আর ‘একবার যেতে দেনা…’।

বাড়িতে গিয়েও গ্রাম আমার খুব বেশি ভালো লাগে না৷ তবে তার গানের লুপে পড়লে মনে হয়, গ্রামটাই তো আসল।

ব্যাক্তিগত জীবনেও অসংখ্য বিরহ কাতর দিন আসে। তখন শুনতেই হয়, ‘আরও কিছু দাও না দুঃখ আমায়’, ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’ কিংবা ‘আমি তো আমার গল্প বলেছি’।

কদিন আগেই রোদের তেজে ভারাক্রান্ত সৈকতে গিয়ে মনে হল, আহ কি গান গেয়ে গেছেন, ‘সাগরের সৈকতে কে যেন দূর হতে’, আহ কি অনবদ্য ক্রিয়েশন।

তখন সময়টাই ছিল অন্যরকম। গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আনোয়ার পারভেজ, সত্য সাহা, খান আতা, নজরুল ইসলাম বাবু, আলাউদ্দীন আলী, সুবল দাশ, আজাদ রহমান, ইমতিয়াজ বুলবুল, এত অসাধারণ সব গানের মানুষ ছিলেন। এদের কেউ কেউ বেঁচেও আছেন, কিন্তু আছে শুধু অতীতটাই।

আমাকেও এদেশে টিকিয়ে রেখেছে এসব গানই। শাহনাজ রহমাতুল্লাহ তাদের মধ্যে প্রধানতম। চলে যাওয়ার পর বুঝি আগামী একশ বছরেও তার মতো শিল্পী আসবে না।

চলে গেলেই আমরা দাম বুঝতে সক্ষম হই। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা। আরও অসংখ্য শীত গ্রীষ্মে আপনার গান থাকবে আমাদের মাঝে।