ক্যাটাগরি

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে প্রকল্পের ‘শম্বুক গতি’: সংসদীয় কমিটির অসন্তোষ

কমিটি মনে করছে, প্রকল্প কাজে ধীরগতি এবং আর্থিক সুশাসন না থাকায় ‘সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য’ ব্যর্থ হচ্ছে।

রোববার সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৩৮টি প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অনুমিত হিসাব কমিটি সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রাক্কলন, আর্থিক মিতব্যয়িতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে পর্যোলচনা করে। এই কমিটিতে কোনো মন্ত্রী সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন না। কমিটি যে কোনো প্রাক্কলিত হিসাব পরীক্ষা করতে পারে।

রোববারের বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৩৮টি প্রকল্পের মেধ্য ১৩টি প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ২৫ শতাংশের কম। ৮টির অগ্রগতি ৫০ শতাংশের কম। ১৬টির অগ্রগতি হয়েছে ৫১ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে। আর একটি প্রকল্পের শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি আব্দুস শহীদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় সঠিকভাবে না হলে সরকারের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় না। কোনো প্রকল্পে শম্বুক গতি হলে এবং আর্থিক সুশাসন না থাকলে লক্ষ্য অর্জন পূরণ হয় না।

“মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের দুরাবস্থার কারণে আস্থা কমেছে। এরকম গাফিলতি হলে কীভাবে হবে!”

বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ৪ হাজার ২৮০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। গত নভেম্বর পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৬ শতাংশ। ব্যয় হয়েছে ১৯৩ কোটি ৭৩ লাখ ৮৩ হাজার টাকা, যা মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৪.৫ শতাংশ।

এ প্রকল্পের জন্য একটি ফোর হুইলার, পাঁচটি ডাবল কেবিন পিক-আপ, একটি মাইক্রোবাস এবং ৪১৮টি মোটর সাইকেল কেনা হয়েছে।

আব্দুস শহীদ বলেন, “গাড়ি কেনা ছাড়া আর কোন কাজই করেনি এ প্রকল্পে। তারা জানিয়েছে, তারা মোটর সাইকেল কিনেছে; আমার উপজেলায় আমি এই প্রকল্পের কোনো মোটরসাইকেল দেখিনি। এগুলো কোথায় তাহলে?

“প্রকল্প পরিচালক যুগ্মসচিব, তিনি সরকারি গাড়ি পান। তাহলে আবার প্রকল্পের গাড়ি কেন? আগামী এক মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের সার্বিক কাজ নিয়ে কমিটিতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।”

এ প্রকল্পের অধীনে করোনাভাইরাস মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের প্রণোদনা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি বলে জানান আব্দুস শহীদ।

তিনি বলেন, “কমিটি জানতে চাইলে তারা বলেছে অর্থ ছাড় হয়নি ইত্যাদি নানা অজুহাত। আমরা জানতে চেয়েছি কেন প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। এখনও না দিলে কবে দেওয়া হবে?

সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পে গাড়ি কেনা বাদে প্রকল্পটির আর কোনো বাস্তব অগ্রগতি না থাকায় এবং প্রকল্পের গাড়ি/মোটরসাইকেল প্রকল্পের কাজের বাইরে ব্যবহার নিয়ে কমিটির পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

মৎস্য অধিদপ্তর থাকার পরেও মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বৈঠকে প্রশ্ন তুলেছে সংসদীয় কমিটি।

কমিটির সভাপতি বলেন, “মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এত অধিদপ্তর। তার ওপর আবার কর্পোরেশনের কাজ কী? তারা জানিয়েছে, ১০ কোটি টাকা লাভ করেছে। কিন্তু ওই কর্পোরেশনে ২৯৭ জন লোকবল। তাহলে লাভ কীভাবে হল? লোকবলের বেতন-ভাতা কত? সরকারের কাজ কী ব্যবসা করা? সরকারতো সেটা করে না।”

বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, পিপিআর রোগ নির্মূল এবং ক্ষুরারোগ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প শুরু হয় ২০১৯ সালের পয়লা জানুয়ারি। ২০২২ সালে এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ২ শতাংশ। ৩৪৫ কোটি ২ লাখ ৯৯ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পের ৬ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে।  

সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিম ফিশারিজ প্রকল্প শুরু হয়েছে ২০১৮ সালের জুন মাসে। ২০২৩ সালের জুনে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে ১০ শতাংশ। এক হাজার ৮৬৮ কোটি ৮৬ লাখ ৫৬ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৩৮ কোটি ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

অধিদপ্তর থাকার পরেও মন্ত্রণালয় ই-সেবা কার্যক্রম নিয়ে প্রকল্প কেন নিয়েছে তা জানতে চেয়েছে কমিটি।

আব্দুস শহীদ বলেন, “মন্ত্রণালয় নিজে প্রকল্প নিত পারে কিনা তা জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রকল্প নেওয়ার যে নীতিমালা সেখানে এটি পারমিট করে কীনা তা জানাতে বলেছি।”

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ৫টি প্রকল্পের কাজে আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি সমান থাকায় বিষয়টি তদারকি করে মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।

ইলিশ মাছ আহরণ নিষিদ্ধ থাকার সময়ে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করে সমুদ্র সম্পদ আহরণের সম্ভাব্য ক্ষেত্র খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করারও সুপারিশ করেছে কমিটি।

করোনাভাইরাস মহামারীকালে খামারিদের সাহায্য দিতে ‘প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত’ ব্যক্তিদের তালিকা কীভাবে করা হয়েছে এবং হালদার উন্নয়ন নিয়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা করা হয়।

আব্দুস শহীদের সভাপতিত্বে কমিটির সদস্য কমিটি সদস্য প্রধান হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, এ বি তাজুল ইসলাম, বজলুল হক হারুন, আহসান আদেলুর রহমান, ওয়াসিকা আয়শা খান এবং খাদিজাতুল আনোয়ার বৈঠকে অংশ নেন।