এ বছর শুধু ভোজ্য তেল আমদানির পেছনে ভারতকে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার খরচ করতে হবে, যা দুই বছর আগের খরচের দ্বিগুণ বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ভোজ্য তেলের দামের ঊর্ধ্বগতিতে ভারতের রান্নায় কী প্রভাব পড়তে যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।
রান্নার তেল ভারতীয় রসনার অন্যতম অনুসঙ্গ। আর এই তেলের মোট চাহিদার ৫৬ শতাংশ পূরণ করা হয় সাতটিরও বেশি দেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে।
একটি ভেজিটেবল অয়েল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সলভেন্ট এক্সট্র্যাকটরস এসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক বি ভি মেহতা বলেন, “কোনো দেশই অতি-আমদানিনির্ভর হয়ে টিকতে পারে না। এটা একটি বড় সঙ্কট। আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমানোর বিষয়টি এই যুদ্ধ থেকে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।”
ভারতীয়রা মূলত পাম, সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল দিয়ে রান্না করে থাকে। আমদানি করা পাম তেলের ৯০ শতাংশ আসে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। ইন্দোনেশিয়া একাই ভারতের চাহিদার প্রায় অর্ধেক তেল সরবরাহ করে।
জাকার্তার একটি দোকানে পাম তেলে বোতলের সারি। ছবি: রয়টার্স
মূল্যবৃদ্ধির জন্য কোভিড-১৯ মহামারী ও ইউক্রেইনের যুদ্ধকে দায়ী করে দেশীয় বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া গত সপ্তাহে তেল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। পাম উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ মালয়েশিয়ায়ও তেলের মজুদ টানটান।
ভারতে সূর্যমুখী তেলের চাহিদার অর্ধেক আমদানি করা হয় ইউক্রেইন ও রাশিয়া থেকে, যার পরিমাণ এই পণ্যের বৈশ্বিক রপ্তানির ৮০ শতাংশ। একটি প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ইউক্রেইনে যুদ্ধ চলার কারণে আগামী অর্থবছরে সেদেশ থেকে সূর্যমুখী তেলের রপ্তানি ২৫ শতাংশ কমে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে রান্নার তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভারত এই পণ্যের উপর শুল্ক ছাড় দিচ্ছে। তবে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
দুই বছরে বিশ্বজুড়ে পাম তেলের দাম ৩০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, ভারতীয়দের ঘরে, রেস্তোরাঁয় ও বেকারিতে যা সবচেয়ে সস্তা ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এক মাসের কম সময়ের মধ্যে ভারতে রান্নার তেলের দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে যে মজুদদারেরা রান্নার তেল মজুদ করছে।
দেশটির ফুটপাতের সস্তা খাবারের বেশিরভাগই তেলে ভাজা। দরিদ্র্য ভারতীয়দেরও খাবারের মূল উপকরণে থাকে তেল। ভারতের জ্যেষ্ঠ খাদ্য কর্মকর্তা সুধাংশু পাণ্ডে স্বীকার করেছেন, রান্নার তেলের দাম বাড়ায় ভুগছে নিম্ন আয়ের মানুষ।
রান্নার তেলের এই দামবৃদ্ধি খাদ্যে মূল্যস্ফীতিকেও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা মার্চে গত ১৬ মাসের মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে ওঠে ৭ দশমিক ৬৮ শতাংশে পৌঁছায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্য অর্থনীতিবিদ দি ইয়াং বলেছেন, এ ধরনের উঁচু পর্যায়ে খাদ্যমূল্য অবস্থান করলে ভারতকে হয়তো ‘রেশন’ ব্যবস্থা চালু করতে হতে পারে, যেহেতু সেখানে স্বল্প মেয়াদে আমদানি ঘাটতি পূরণের কোনো বিকল্পই নেই।
ইউক্রেইনে সূর্যমুখী ক্ষেত। যুদ্ধের ডামাডোলে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। ফাইল ছবি: রয়টার্স
এই ঘাটতি আংশিক পূরণের জন্য ভারত এ বছর নিজ দেশে সরিষা ও সয়াবিনের ভালো ফলনের আশায় বুক বেঁধেছে।
সুধাংশু পাণ্ডে বলেন, “আমাদের নিজস্ব উৎপাদন বাড়ায় ভারতে এখনও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির সম্পূর্ণ প্রভাব অনুভূত হচ্ছে না।
“আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বাড়ার তুলনায় এখানকার বাজারে রান্নার তেলের দাম অর্ধেক বেড়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত, আমাদেরকে স্বনির্ভর হতে হবে এবং সেটা তখনই হবে যখন চাষিরা তেলবীজ আবাদের জন্য আকর্ষণীয় দাম পাবে।”
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের একটি পরিকল্পনা হচ্ছে তেলের জন্য আরও বেশি পাম গাছ রোপণ করা। এটা খুবই অর্থকরী ফসল, যা থেকে সয়াবিনের মতো ফসলের চেয়ে কয়েকগুণ তেল উৎপাদন করা যায়। পাম তেল খুবই বৈচিত্র্যময় এবং ভোগ্য পণ্য ও শিল্পখাতে ব্যবহারের জন্য উপযোগী।
তবে পাম গাছ অনেক বেশি পানি শোষণকারী উদ্ভিদ এবং নতুন পাম বাগান করতে বিপুল পরিমাণ বনাঞ্চল কেটে ফেলতে হবে। ভারতীয় সরকারের প্রস্তাব হচ্ছে নতুন পাম বাগানের এক-তৃতীয়াংশ গড়ে তোলা যেতে পারে সেদেশের পার্বত্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলে।
স্বাভাবিকভাবেই এই প্রস্তাবের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পরিবেশবিদরা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার উদাহরণ টানছেন, যেখানে পাম তেলের জন্য তাদের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চিরহরিৎ বন উজাড় করতে হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ পাম ক্ষেত। ফাইল ছবি: রয়টার্স
সুধাংশ পাণ্ডে বলেন, তাদের সরকার ভারতে পাম তেলের উৎপাদন তিন গুণ করার পরিকল্পনা করছে, যা বর্তমানে ২ দশশিক ৭ শতাংশে অবস্থান করছে।
তবে এ মুহূর্তে ভারতীয়রা রান্নার তেলের ‘স্বস্তা বিকল্পে’র দিকে এগুচ্ছে।
ঐতিহ্যগতভাবে, ভারতীয়রা সুগন্ধি তেল দিয়ে রান্না করে আসছে এবং সরিষা, বাদাম, নারকেল ও তিলের তেল তাদের খুবই পছন্দ। সেদেশের অনেক এলাকার বাসিন্দা এসব তেলই ব্যবহার করে। বিদেশি উদ্ভিজ্জ ও বীজ তেলের দিকে ঝুঁকে পড়ার একটি বড় কারণ নগরায়ন ও কসমোপলিটন সংস্কৃতির প্রভাব।
তাছাড়া এ ধরনের তেল সস্তা এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প বলে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করা হয়।
খাদ্য-ইতিহাসবিদ পৃথা সেন বলেন, “আমাদের রান্নার তেলের সঙ্কট অংশত নিজেদের তৈরি, কারণ সুপারিশকারীরা সফলভাবে আমদানি করা উদ্ভিজ্জ তেল বিক্রি করতে পেরেছে।”
খাদ্য বিষয়ক লেখক মরিয়ম এইচ রেশির মতে, অনেকেই বিশ্বাস করেন, ভারতে যেহেতু আরও মানুষ শহরমুখী হচ্ছে, শহুরে রান্নাও দিন দিন পাম ও সূর্যমুখীর মতো বর্ণহীন ও গন্ধহীন তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যা বৈচিত্র্যপূর্ণ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের রসনার জন্য সহনীয়।
আর এখন এসব রান্নার তেলের দাম বৃদ্ধি ভারতীয়দের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। রাঁধুনী রাকেশ রঘুনাথন বলেন, “ভারতীয়দের জন্য উদ্ভিজ্জ তেল অনেকটা ভূমধ্যসাগরীয় রসনায় জলপাই তেলের মতো। এই তেলের দাম বৃদ্ধি আমাদের রান্নার কাজে অবশ্যই প্রভাব ফেলবে।”